বাংলাদেশ

দুই জোটে আসন ভাগাভাগি

শরিকদের সঙ্গে সমঝোতায় হিমশিম বিএনপি

নির্বাচন ২০১৮

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

শরিকদের সঙ্গে সমঝোতায় হিমশিম বিএনপি

  কামরুল হাসান

দফায় দফায় বৈঠক করেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছতে পারছে না বিএনপি জোট। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন বণ্টন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে জোটের প্রধান শরিক বিএনপি। যোগ্য ও শক্তিশালী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছে না দলটি।

দুই জোটকে ৫০ থেকে ৫৫টি আসন ছাড়তে চাইছে বিএনপি। তবে নিজেদের প্রার্থীকে যোগ্য দাবি করে আরও আসন চাইছে জোটের শরিকরা। আজ বৃহস্পতিবার ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত ফয়সালা হবে বলে জোটের নেতারা আশা করছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা গুছিয়ে আনা হয়েছে। দু-একদিনের মধ্যে জোটের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না সমকালকে বলেন, আসন বণ্টনের বিষয়টি সমাধানের চূড়ান্ত পথে রয়েছে। কাল (বৃহস্পতিবার) বিকেলে ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক রয়েছে। সেখান থেকেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে। বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবার ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।

বিএনপি সূত্র জানায়, আসন বণ্টন নিয়ে ২০ দলীয় জোটের চেয়ে ঐক্যফ্রন্টে সমস্যা বেশি হচ্ছে। ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্য পঞ্চাশের বেশি আসন চাইছে। এর মধ্যে গণফোরামের আসন সংখ্যা বেশি।

বিষয়টি সমাধান করতে গতকাল বুধবার দুপুরে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে নাগরিক ঐক্যসহ অন্যান্য দলের সঙ্গেও ধারাবাহিক বৈঠক করেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। এর আগেও দফায় দফায় এসব দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে দলটি। তবে এখনও কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি।

সূত্র জানায়, নির্বাচনকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই বলে মনে করছে বিএনপি। সে ক্ষেত্রে দলটি নির্বাচনে জয়লাভকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই জয় পেতে তারা জনপ্রিয় ও দক্ষ নেতাকে মনোনয়ন দিতে চায়। জোটের শরিক দলের নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তা কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পাবে, তার হিসাবও করা হচ্ছে। প্রয়োজনে নির্বাচিত হতে পারলে রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিক দলগুলোকে গুরুত্ব দেবে তারা। কিন্তু আবেগের বশে কোনো নেতাকে মনোনয়ন দিয়ে হারের ঝুঁকি বাড়াতে রাজি নয় বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

সূত্র আরও জানায়, গণফোরামকে ছয়টি আসন দিতে এরই মধ্যে সম্মতি জানিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে দলটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টুকে ঢাকা-৭, নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরীকে ঢাকা-৬, রেজা কিবরিয়াকে হবিগঞ্জ-১, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে পাবনা-১ ও সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে মৌলভীবাজার-২, মেজর জেনারেল (অব.) আ ম সা আমিনকে কুড়িগ্রাম-২ আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হবে। তবে দলটির পক্ষে আরও ১২টি আসন দাবি করা হচ্ছে। তা নিয়েই দরকষাকষি চলছে।

গণফোরামকে দেওয়া ছয়টি আসনের মধ্যে ঢাকা-৬ নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাই এ আসনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। বিএনপি মনে করে, আসনটি ছাড়া হলে জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে সুব্রত চৌধুরীর পক্ষে কাজ করবে কি-না তা নিয়ে সন্দিহান বিএনপি।

দলটির সিনিয়র নেতারা জানান, ঢাকা-৬ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তিনি দেশের বাইরে থাকলেও তার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন এখান থেকে নির্বাচন করতে চান। তিনি ইতিমধ্যে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। এ আসনে গণফোরামের কোন ভোটব্যাঙ্ক নেই। বিএনপির নেতাকর্মীদের সক্রিয় করতে না পারলে গনফোরাম প্রার্থীর ভরাডুবি ঘটতে পারে। তাই অন্য কাউকে মনোনয়ন দিয়ে সুব্রত চৌধুরীকে অন্যভাবে মূল্যায়নের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।

জেএসডিকে ৩টি আসনের বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে দলটির সভাপতি আ স ম আবদুর রবের লক্ষ্মীপুর-৪, সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতনের কুমিল্লা-৪ রয়েছে। তবে দলটির পক্ষে আরও ৪টি আসন দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-১৪ আসনে কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী ও ঢাকা-১৮ আসনে শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন রয়েছেন। এর বাইরে বগুড়া-৭ ও কিশোরগঞ্জ-৩ আসনও তারা দাবি করেছে।

জেএসডি সহসভাপতি তানিয়া রব সমকালকে বলেন, আসন বণ্টনের বিষয়টি এখনও সমাধান হয়নি। তবে হয়ে যাবে। আমরা যোগ্য প্রার্থীদেরই প্রাধান্য দেব। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আমরা যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে ২টি আসন দিতে চাইছে বিএনপি। তা হলো- টাঙ্গাইল-৪ ও টাঙ্গাইল-৮। তবে দলটির পক্ষ থেকে আরও ৩টি আসন দাবি করা হয়েছে। সেগুলো হলো- টাঙ্গাইল-৭, টাঙ্গাইল-৫ এবং গাজীপুর-৩।

নাগরিক ঐক্যকে ২টি আসন দেওয়ার বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তা হলো দলটির আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার জন্য বগুড়া-২ এবং দলটির নেতা এস এম আকরামের জন্য নারায়ণগঞ্জ-৫। তবে তাদের পক্ষে আরও ৪টি আসন দাবি করা হচ্ছে। তবে সেসব আসনে দলটির প্রার্থীর থেকে বিএনপির প্রার্থী অনেক শক্তিসালী।

আসন বণ্টনে ২০ দলীয় জোটর শরিকদের মধ্যে সমস্যা না থাকলেও অস্বস্তিতে রয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে জামায়াতের সঙ্গে ২৫টি আসনে সমঝোতা করে দলটির প্রার্থীদের ধানের শীষে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে দিনাজপুর-১ আসনে জামায়াত নেতা মুহম্মদ হানিফের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। তিনি আপিল করেছেন।

নিবন্ধন হারানো জামায়াত আরও তিনটি আসন চাইছে। সে আসনগুলো হলো- চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, পাবনা-১, রাজশাহী-১। রাজশাহী-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান। তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তিনি আপিল করেছেন। পাবনা-১ চান মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। ঢাকা-১৫ আসন নিয়েও বেকায়দায় আছে বিএনপি। এ আসন থেকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচন করতে চান।

এলডিপিকে ৪টি আসন দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে চট্টগ্রাম-১৪, মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদকে কুমিল্লা-৭, আবদুল করিম আব্বাসীকে নেত্রকোনা-১ ও শাহাদাত হোসেন সেলিমকে লক্ষ্মীপুর-১ দেওয়া হয়েছে। দলটি আরও ১টি আসনের জন্য জোর দাবি জানাচ্ছে। চট্টগ্রাম-৭ আসন পেতে গতকাল রাতেও গুলশান কার্যালয়ে বৈঠক করেন নেতারা।

দলটির যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম জানান, ৪টি আসনের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছালেও আরও ২টি আসনে তাদের যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। তারা দেখবেন বলে জানিয়েছেন।

এ ছাড়া জোটের অন্যান্য শরিক দলের মধ্যে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. টি আই ফজলে রাব্বীর জন্য গাইবান্ধা-৩সহ আরও একটি আসন ছাড়বে বিএনপি। কল্যাণ পার্টির মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম চট্টগ্রাম-৫, বিজেপির আন্দালিভ রহমান পার্থ ভোলা-১, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি ওয়াক্কাস যশোর-৫ এবং শাহীনুর পাশা চৌধুরী সুনামগঞ্জ-৩ আসন পাচ্ছেন। খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের হবিগঞ্জ-৪, জাগপার শফিউল আলম প্রধানের মেয়ে ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান পঞ্চগড়-২, মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মেয়ে পিপলস পার্টির রিটা রহমান রংপুর-৩ আসন পাচ্ছেন। এর বাইরে মাইনরিটি জনতা পার্টির সুকৃতি কুমার মণ্ডল যশোর-৪ আসন পেতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

হারাচ্ছে জমি, অস্তিত্ব সংকটে সমতলের আদিবাসীরা


আরও খবর

বাংলাদেশ
হারাচ্ছে জমি, অস্তিত্ব সংকটে সমতলের আদিবাসীরা

ভূমি কমিশন গঠনের দাবি

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হাসনাইন ইমতিয়াজ

'জমি চাই মুক্তি চাই' স্লোগানে ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল নেতা সিধু, কানু, ভৈরব ও চাঁদ- চার ভাই ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ইতিহাসে তা 'সাঁওতাল বিদ্রোহ' নামে পরিচিত। ওই আন্দোলনে আত্মোৎসর্গ করে গেছেন তারাসহ বহু মানুষ। আত্মদানে মহীয়ান ওই বিদ্রোহের ১৬৩ বছর পরও সেই ভূমির জন্যই স্বাধীন বাংলাদেশে আজও জীবন দিতে হচ্ছে সমতলের আদিবাসীদের। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৪ সালে পিতা ফাগু সরেন এবং ২০১১ সালে বড় ভাই গোসাই সরেনকে হারিয়েছেন দিনাজপুরের আদিবাসী কৃষক টুডু সরেন। ২০১৪ সালে নিজেও খুন হন। তার স্ত্রীর ওপর হামলা হয়েছে, কিন্তু ভূমি রক্ষা হয়নি। ভূমিদস্যুরা জাল দলিলের মাধ্যমে টুডু সরেনের ৩৩ একর জমি দখল করে নিয়েছে। নিজেদের বসতভিটা সরকারের অধিগ্রহণের প্রতিবাদে জীবন দিয়েছেন টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের পিরেন স্ন্যাল। জমি ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে ২০১৬ সলে গাইবান্ধায় পুলিশের গুলিতে জীবন হারিয়েছেন তিন সাঁওতাল। এভাবে প্রায়ই মামলা-হামলা, অত্যাচার-নির্যাতনে ভূমিহীন হচ্ছেন সমতলের আদিবাসীরা, যেসব জমিতে শত শত বছর ধরে তারা বাস করেছেন।

ভূমি হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে আদিবাসীরা। কারণ এই ভূমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তাদের জীবন ও সংস্কৃতি। জমির সঙ্গে সঙ্গে কমছে আদিবাসীদের সংখ্যাও। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের সাঁওতাল, দক্ষিণাঞ্চলের রাখাইন, মধ্যাঞ্চলের গারোদের মতো সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দখলি জমি যেমন কমছে, তেমনি কমছে তাদের জনসংখ্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদিবাসীদের জীবনবৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। এ জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ভূমিহীন হচ্ছে আদিবাসীরা :দেশের আদিবাসীদের সংখ্যা নিয়ে নিখুঁত কোনো পরিসংখ্যান নেই। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে দেশে প্রায় ১৬ লাখ আদিবাসী রয়েছে। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর দাবি, দেশে ৫৪টির বেশি জাতিসত্তার ৩০ লাখ আদিবাসী রয়েছে। এর মধ্যে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দুই-তৃতীয়াংশের বসবাস। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের তথ্যমতে, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় ৩৮টি জাতিসত্তার ২০ লাখ আদিবাসী বসবাস করে। এদের মধ্যে রয়েছে সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও, রাজোয়াড়, তুরি, কর্মকার, মালো, মাহাতো, চাঁই, বাইছনী, লহরা, হাঁড়ি, ঘাটোয়াল, দোষাদ, চাঁড়াল, ডহরা, ভূমিজ, মালপাহাড়িয়া, গন্ড, পাটনি,

বাগদি, মাহালী, মুসহর, ভুঁইমালি, কোচ, তেলী, গোড়াত, বেতিয়া, নুনিয়াহাড়ি, রাজবংশী, পাহাড়িয়া, ভূঁঁইয়া, রবিদাস, রাই, বেদিয়া ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী। পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার উপকূলবর্তী এলাকায় রাখাইনদের বসবাস। টাঙ্গাইলের মধুপুর জঙ্গল ঘিরে গড়ে উঠেছে গারো ও কোচ আদিবাসীদের গ্রাম। এই আদিবাসীরা প্রধানত কৃষি ও ভূমির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের দাবি, এক সময় যথেষ্ট জমি থাকলেও বর্তমানে তাদের ৮৫ শতাংশই ভূমিহীন। 'আদিবাসী মানুষের ভূমি অধিকার-উন্নয়ন-মানবাধিকার' শীর্ষক এক গবেষণাপত্রে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেছেন, সমতলের সাঁওতালদের ৭২ শতাংশ, পাত্র ও পাহান খানাদের ৯০ শতাংশ এবং গারো, হাজং, ডালু ও রাখাইনদের ৬৬ শতাংশের বেশি লোক বর্তমানে ভূমিহীন।

আবুল বারকাত তার আরেক গবেষণায় দেখিয়েছেন, সমতলের ১০ আদিবাসী জনগোষ্ঠী গত কয়েক দশকে ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ বিঘা জমি হারিয়েছে। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী যার বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাঁওতালরা। গত তিন প্রজন্মে তাদের তিন লাখ বিঘা জমি বেহাত হয়েছে, যার বাজারমূল্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

যেভাবে ভূমি হারাচ্ছে আদিবাসী :পেছনে ফিরলে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর থেকে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মতো আদিবাসী জনগণও নিজেদের জমি হারিয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর আরেক দফা বাস্তুচ্যুত হয় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার লোকেরা। প্রভাবশালীদের ষড়যন্ত্র, মামলা-হামলার পাশাপাশি নিজেদের শিক্ষার অভাব, অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও দারিদ্র্যের কারণে ভূমিহীন হচ্ছে আদিবাসী। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধকি জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয় তারা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা জাল দলিল করে, মামালা-হামলার মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং ভূমি অফিসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় এসব জমি দখল করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার ট্রাইবাল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রবীন্দ্র বর্মণ বলেন, শিক্ষার অভাবে আদিবাসীদের জমি বেহাত হচ্ছে। তিনি তার এক আত্মীয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সে বিক্রি করেছিল পাঁচ শতাংশ জমি। ক্রেতা ৫-এর পর আরেকটি ৫ বসিয়ে ৫৫ শতাংশ জমি হাতিয়ে নিয়েছে।

অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত তার এক গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ১৬টি কারণে আদিবাসীরা ভূমিহীন হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে- নিরক্ষতা, জমির দলিল না থাকা, আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব, প্রভাবশালী রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক শক্তির অত্যাচারসহ নানা কারণে আদিবাসী গোষ্ঠীর লোকজন বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংরক্ষিত বন গড়ে তুলতে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় মধুপুর বনের ৯ হাজার ১৪৫ একর জমি সংরক্ষণের জন্য ২০১৬ সালে গেজেট প্রকাশ করায় গেজেটের আওতাভুক্ত ১৩ গ্রামের গারো ও কোচ নৃগোষ্ঠীর এক হাজার ৮৩ পরিবারের ছয় হাজার অধিবাসী এখন উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

মধুপুরের জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, সংরক্ষিত বন ঘোষণার প্রতিবাদ করায় ২০১৬ সালে ইউজিন নকরেকসহ ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

পটুয়াখালীর পাহাম হালিবাট বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উথা চিং বলেন, ভুয়া দলিল ও মামলার মাধ্যমে হয়রানি করে রাখাইনদের ভূমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, মিথ্যা মামলাসহ নারীদের শ্নীলতাহানি, ধর্ষণ, লোকজনকে হত্যার মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি দখল করা হয়। এ নিয়ে সুবিচার পান না বলে তিনি অভিযোগ করেন। ২০০১ সালে নওগাঁর মহাদেবপুরে আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেনকে হত্যার পর দেড় যুগেও তার বিচার হয়নি।

অস্তিত্ব সংকটে আদিবাসীরা :গবেষকদের মতে, ১৯ শতকের গোড়ার দিকে পটুয়াখালী ও বরগুনার উপকূলীয় এলাকায় ৫০ সহস্রাধিক রাখাইন জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। ৭০ দশকেও তাদের জনসংখ্যা ছিল ৪০ সহস্রাধিক। বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের ২০১৪ সালে পরিচালিত জরিপমতে, উপকূলীয় অঞ্চলে আড়াই হাজার রাখাইন রয়েছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলে এক সময় ২৪২টি রাখাইন গ্রাম ছিল। এর মধ্যে ১৯৫টিতে এখন রাখাইন বসতি নেই। এভাবে গত ২০০ বছরে ৮০ ভাগ রাখাইন গ্রাম তাদের হাতছাড়া হয়েছে। জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ৯০ শতাংশ। শুধু রাখাইন নয়; সাঁওতাল, ওঁরাও, গারো, মাহাতো, মাহালি, রাজবংশীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠী অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। ধীরে ধীরে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিও বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একেএম শাহনাওয়াজ বলেন, সাঁওতালরাই এদেশের আসল ভূমিপুত্র। সাঁওতালরা হাজার বছর ধরে তীর-ধনুক দিয়ে আর্যদের ঠেকিয়েছে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছে। তীর-ধনুক নিয়েই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। কিন্তু তারাই এখন নিজভূমে সংখ্যালঘু।

এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, পূর্বপুরুষের ভূমির সঙ্গে শুধু জীবিকাই নয়, জড়িয়ে আছে আবেগ, ধর্ম, সংস্কৃৃতি। এখান থেকে বিতাড়িত হওয়া মানে শিকড় কেটে যাওয়া। আদিবাসীদের কাছে ভূমি হলো তাদের অস্তিত্বের বিষয়।

আইনগত সমাধান ও ভূমি কমিশন গঠন :পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আদিবাসীদের রক্ষায় আইন বা বিধিবিধান যুগোপযোগী করে পূর্বপুরুষদের প্রথাগত ভূমির ওপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় তাদের জন্য বিশেষ আইন করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন- জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বসবাসরত ভূমির ওপর তাদের আইনি অধিকার আছে। কেনিয়ার ওজিয়েক ও বতসোয়ানার বাসারওয়া সান জনগোষ্ঠীকে তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে সরিয়ে সংরক্ষিত পার্ক প্রতিষ্ঠা আদালতের মাধ্যমে বেআইন ঘোষিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে।

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া বলেন, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষায় আইন রয়েছে। এর যথাযথ প্রয়োগ হলে আদিবাসীদের ভূমি বেহাত হওয়া অনেকাংশেই থামানো যাবে।

এ বিষয়ে আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাসের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, সমতলের আদিবাসীদের ভূমির অধিকার রক্ষার জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।

পরের
খবর

জমছে ভোটের প্রচার বাড়ছে সহিংসতা


আরও খবর

বাংলাদেশ
জমছে ভোটের প্রচার বাড়ছে সহিংসতা

নেত্রকোনায় আওয়ামী লীগের মিছিলে পেট্রোল বোমা হামলা, গুলি - চট্টগ্রামে বিএনপি নেতা আমীর খসরুর গণসংযোগে হামলা - নোয়াখালীতে খোকনের গাড়ি ভাংচুর - সিরাজগঞ্জে আ'লীগ নেতার বাড়িতে গুলিবর্ষণ

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সমকাল ডেস্ক

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে একদিকে যেমন প্রচার জমে উঠেছে, অন্যদিকে চলছে সহিংসতাও। গতকাল বুধবার রাজধানীর সদরঘাটে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ভোলা-৩ আসনের প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নেত্রকোনার আটপাড়ায় আওয়ামী লীগের মিছিলে পেট্রোল বোমা হামলায় ৭ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে জেলার কেন্দুয়ায় মিছিল বের হলে তাতে বিএনপি প্রার্থী গুলি ছুড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে ককটেল বিস্ম্ফোরণ ও গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর গণসংযোগে হামলার ঘটনা ঘটেছে। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকনের গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে মহাজোট-ঐক্যফ্রন্ট সংঘর্ষে দু'পক্ষের অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় উপজেলা বিএনপি সভাপতি, সম্পাদকসহ ৭০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৭ জন। এ ছাড়া খুলনায় প্রতিপক্ষের হামলায় ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীসহ ৫ জন আহত হয়েছেন। এগুলোসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা-সংঘর্ষ ও পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হয়েছেন শতাধিক। সমকাল প্রতিবেদক, ব্যুরো, অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :

ঢাকা :বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ভোলা-৩ আসনের প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বীরবিক্রম লঞ্চযোগে নিজ এলাকায় যাওয়ার পথে পুরান ঢাকার সদরঘাটে হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় ৮-১০ জনের মতো নেতাকর্মী আহত হন। পরে বাধ্য হয়ে মেজর হাফিজসহ অন্যরা সদরঘাট থেকে ফেরত আসেন। হামলার শিকার ছাত্রদল নেতা মামুন আহমেদ বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার জন্য নিজ এলাকায় যাওয়ার জন্য নেতাকর্মীসহ মেজর হাফিজ তাসরিফ-৪ লঞ্চে ওঠেন। এ সময় স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা এবং লঞ্চ ভাংচুর করে। এ বিষয়ে সদরঘাট নৌ পুলিশের ওসি আবদুর রাজ্জাক জানান, লঞ্চযোগে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ভোলা যাচ্ছেন এমন সন্দেহে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এ এলাকায় মিছিল করেছেন। তবে কোনো ভাংচুর হয়েছে কি-না তা তিনি জানেন না।

নেত্রকোনা :বুধবার সন্ধ্যায় আটপাড়ার ব্রজের বাজার ব্রিজে আওয়ামী লীগের মিছিলে দুর্বৃত্তরা পেট্রোল বোমা হামলা চালিয়েছে। এতে উপজেলা যুবলীগের সভাপতি নিজাম ইয়ার খান, ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুফল খান, ছাত্রলীগ নেতা শিবলী, মোহন, তুহিন, হৃদয় ও লিমন আহত হন। তাদের আটপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী মো. খায়রুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস রানা আনজু এ ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের দায়ী করেছেন।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী অসীম কুমার উকিলের স্ত্রী যুবমহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আটপাড়া উপজেলা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক অপু উকিল সংবাদ পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আহতদের দেখতে যান এবং দোষীদের শাস্তি দাবি করেন।

আটপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি খাইরুল কবির তালুকদার বলেন, ইটাখলা বাজারে আমাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি সভা চলছিল। এ সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্র্মীরা আমাদের অফিসে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। তারা নিজেরা পেট্রোল বোমা বিস্ম্ফোরণ ঘটিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।

আটপাড়া থানার ওসি অভিরঞ্জন দেব জানান, বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা পেট্রোল বোমার বিস্ম্ফোরণ ঘটিয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) :কেন্দুয়ায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের প্রতিবাদ মিছিলে বিএনপি প্রার্থী রফিকুল ইসলাম হিলালী গুলিবর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল সন্ধ্যার এ ঘটনায় ৬-৭ নেতাকর্মী আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আটপাড়ায় আওয়ামী লীগের মিছিলে হামলার খবর পেয়ে প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়।

মিছিলটি বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বিএনপি কার্যালয় থেকে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। পরে মিছিলকারীরা বিএনপি কার্যালয়ের দিকে ধাওয়া করলে রফিকুল ইসলাম হিলালী তার বাসার ছাদের ওপর থেকে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মিছিলে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি কামরুল হাসান ভূঞাসহ ১০-১২ জন আহত হন।

এ ব্যাপারে রফিকুল ইসলাম হিলালীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও মোবাইল ফোনটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পৌর বিএনপি সভাপতি জয়নাল আবেদীন ভূঞা ফোনে বলেন, মিছিলকারীরা বিএনপি দলীয় কার্যালয়ের ভেতর একটি গাড়িও ভাংচুর করতে থাকে ও বাসভবনের ভেতর ঢোকার চেষ্টা করে। এ সময় হিলালী আত্মরক্ষার্থে বাসার ভেতর থেকে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন।

সিরাজগঞ্জ :মঙ্গলবার গভীর রাতে সদর উপজেলার শিয়ালকোল ইউনিয়নের ধুকুরিয়া গ্রামে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি জগদীশ চন্দ্র সাহার বাড়িতে দুর্বৃত্তরা ককটেল বিস্ম্ফোরণ ও গুলি বর্ষণ করে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আতাউর রহমান রতন জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে মোটরসাইকেলে ১০-১২ সন্ত্রাসী জগদীশের বাড়ির পেছনে তিনটি ককটেল বিস্ম্ফোরণ ঘটায় এবং দুই রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। বিস্ম্ফোরণের শব্দে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ককটেলের আলামত উদ্ধার করেছে পুলিশ।

সদর থানার ইন্সপেক্টর (অপারেশন) নুরুল ইসলাম বলেন, স্থানীয়রা গুলি ছোড়ার কথা বললেও ঘটনাস্থল থেকে কোনো গুলির খোসা খুঁজে পাওয়া যায়নি। শিয়ালকোল ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদর থানা পুলিশের ট্যাগ অফিসার উপপরিদর্শক আবু জাফর বুধবার দুপুরে জানান, ঘটনার বিষয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলার প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে মামলা হলে তদন্তসাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম :বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর গণসংযোগে হামলার ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে। গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে নগরীর সদরঘাট থানার পূর্ব মাদারবাড়ির মাঝিরঘাট রোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলার জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করেছে বিএনপি। চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন এ বিএনপি নেতা। আহতদের মধ্যে রয়েছেন শিশির, রনি, রানা ও টিটু। এর মধ্যে টিটু স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল এবং অন্য তিনজন ছাত্রদলের নেতাকর্মী। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে তাদের। সদরঘাট থানার ওসি নেজাম উদ্দিন বলেন, এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগও করেনি। তবে বিএনপি নেতা আমীর খসরু জানিয়েছেন, মাদারবাড়ি এলাকায় প্রচার চালাতে যাওয়ার আগেই বিষয়টি আমি নিজেই সদরঘাট থানার ওসিকে জানিয়েছিলাম। ওসি বিষয়টা জানেন না, এটা ঠিক নয়।

নোয়াখালী :গতকাল সন্ধ্যায় নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ বাজারে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মাহাবুব উদ্দিন খোকনের গাড়ি ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ হামলার জন্য আওয়ামী লীগ কর্মীদের দায়ী করেছে বিএনপি। বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে স্লোগান দিলে উপস্থিত আশপাশে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এর প্রতিবাদ জানায়। এ নিয়ে দু'পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

খুলনা :গতকাল বিকেলে খুলনা-৩ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুজ্জাম্মিল হক প্লাটিনাম জুট মিল শ্রমিক কলোনিতে গণসংযোগকালে প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়ে আহত হয়েছেন। এ সময় আহত অন্য ৪ জন হলেন প্রার্থীর ছেলে ও ইসলামী যুব আন্দোলনের খুলনা মহানগরের যুগ্ম সম্পাদক তানভীর, ইসলামী আন্দোলন নেতা হাসিব, আশিকুর রহমান ও রফিকুল হাসান। আহতদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের অভিযোগ, হামলাকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এ ব্যাপারে মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ শাহজালাল হোসেন সুজনকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

পটুয়াখালী :মঙ্গলবার বিকেলে জেলার রাঙ্গাবালীতে পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনে মহাজোট মনোনীত আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. মহিব্বুর রহমান মুহিব (নৌকা) এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত বিএনপির প্রার্থী এবিএম মোশাররফ হোসেন (ধানের শীষ) সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ৪০ জন আহত হন। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকায় বিএনপির ২০ জনকে আটক করে পুলিশ।

এদিকে জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. কবির হোসেন তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান ফরাজীসহ দলের ৪৫ নেতাকর্মীর নামে ও অজ্ঞাতনামা আরও ৭০ জনকে আসামি করে বিশেষ ক্ষমতা ও বিস্ম্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করা হয়েছে।।

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) :নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আওয়ামী লীগ মনোনীত ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ১৭ জন আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, বুধবার দুপুর ১টার দিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজী (বীরপ্রতীক) ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কাজী মনিরুজ্জামান মনিরের কর্মীরা রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কাজী আব্দুল হামিদ উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে রাস্তায় আলাদা আলাদাভাবে পোস্টার লাগাতে থাকেন। এ সময় আওয়ামী লীগ কর্মী রাসেল ও বিএনপি কর্মী আবু মাসুমের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে উভয়পক্ষ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

নাটোর :সিংড়া উপজেলার শেরকোল ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে বিএনপি নেতাকর্মীদের হাতুড়িপেটা ও বেধড়ক মারধরের অভিযোগ করা হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উপজেলার শেরকোল ও পুঠিমারী বাজারে পৃথকভাবে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়াও খরমকুড়ি, শাহাবাজপুর ও চামারী ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে ধানের শীষ প্রতীকের প্রচারণা মাইক ভাংচুর করে আওয়ামী লীগ কর্মীরা। এ বিষয়ে বুধবার সকালে সিংড়া সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর পৃথক ৬টি লিখিত অভিযোগ করেছেন উপজেলা বিএনপি সভাপতি মজিবুর রহমান মন্টু। যুবলীগ নেতা আরিফুল ইসলাম এসব অভিযোগকে মিথ্যাচার ও ভিত্তিহীন দাবি করেন।

তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) : সিরাজগঞ্জ-৩ তাড়াশ আসনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল মান্নান তালুকদারের নির্বাচনী পথসভায় দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে পথসভা পন্ড করে দিয়েছে। গতকাল বিকেলে উপজেলার বারুহাঁস ইউনিয়নের বিনোদপুর খেলার মাঠে এ ঘটনায় ৭-৮ নেতাকর্মী আহত হন। এ সময় দুটি মাইক্রোবাস ভাংচুরের ঘটনা ঘটে।

কুমিল্লা :গণসংযোগে দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা, মারধর এবং হয়রানির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন কুমিল্লা-৬ সদর আসনের বিএনপি প্রার্থী আমিন-উর রশিদ ইয়াছিন। বুধবার দুপুরে বিএনপি প্রার্থী তার বাসায় সংবাদ সম্মেলন ডেকে এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, বুধবার সকালে কুমিল্লার আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার সময় প্রবেশ গেটে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব চৌধুরীর ওপর হামলা করেছে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মাসুদুর রহমান মাসুদের নেতৃত্বে ১৫-১৬ জন যুবক মাহবুব চৌধুরীকে অপহরণের চেষ্টা করে, বাধা দিলে তাকে ও তার স্ত্রীকে মারধর করে। স্থানীয়রা এগিয়ে এলে অপহরণে ব্যর্থ হয়ে মাহবুব চৌধুরী ও তার স্ত্রী নাসরিন খানমকে আহত করে নগদ ৮০ হাজার টাকাসহ মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। আহত মাহবুব চৌধুরী বর্তমানে কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন।

অভিযোগ অস্বীকার করে কুমিল্লা সিটির ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাসুদুর রহমান মাসুদ জানান, আদম ব্যবসার ১৭ লাখ টাকা পাবে বলে কয়েকজন যুবক তাকে মারছিল। আমি তখন এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। এ সময় আমি রিস্ক নিয়ে তাকে রক্ষা করি।

ঝিনাইদহ :ঝিনাইদহ-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল মজিদ নৌকার সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলা, নৈরাজ্য, নির্বাচনী প্রচার মাইক ভাংচুর ও প্রচারণা কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগ এনেছেন। গতকাল বুধবার ঝিনাইদহ নির্বাচনী তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ বরাবর এ অভিযোগ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেন তিনি।

কালিয়াকৈর (গাজীপুর) :গাজীপুর-১ আসনের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর বাজার এলাকায় বুধবার সকালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষের ঘটনায় তাৎক্ষণিক দুই দলের সমর্থকরা পৃথক দুটি সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি প্রার্থী চৌধুরী তানভীর আহম্মদ সিদ্দিকী কালিয়াকৈর কলেজ রোডের দলীয় কার্যালয়ে এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপির সমর্থকরা সফিপুর পৌর আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেন। দুই দলের নেতাকর্মীরা হামলা, গাড়ি ভাংচুরের দায় একে অপরের ওপর চাপান।

এদিকে পৌরসভার পল্লী?বিদ্যুৎ এলাকায় পৌর যুবলীগের ৭নং ওয়ার্ড সহসভাপতি মো. মনিরুজ্জামান মনিরের মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় বিএনপি প্রার্থীর সমর্থকরা।

কালাই (জয়পুরহাট) :জয়পুরহাটের কালাইয়ে ধানের শীষের পোস্টার টাঙানোকে কেন্দ্র করে ইউনিয়ন বিএনপির নেতা আব্দুল হান্নান নামের এক যুবককে মারধর করে গুরুতর আহত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে কালাই থেকে তার গ্রামের বাড়ি পুনট ইউনিয়নের তিশরাপাড়া গ্রামে যাবার পথে ওই গ্রামের মোড়ে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে তাকে মারধর করা হয়েছে। পুনট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

কেশবপুর (যশোর) :একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবুল হোসেন আজাদের ২টি প্রচার মাইকের ব্যাটারি ছিনতাইসহ প্রচারকারীদের মারধর করার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার রাতে উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে ধানের শীষ মার্কার নির্বাচনী এজেন্ট ও পৌর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি জুলফিকার আলী এক প্রেস ব্রিফিং-এ ওই অভিযোগ করেন।

রানীনগর (নওগাঁ) সংবাদদাতা :নওগাঁর রানীনগরে বিএনপির নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার রাতে উপজেলার পারইল উইনিয়নের বগারবাড়ী বাজারে এ ঘটনা ঘটে।

কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ) :কুলিয়ারচরের উছমানপুর ইউনিয়নে গতকাল নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশি হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের বিএনপি দলীয় প্রার্থী মো. শরীফুল আলম, ৩ পুলিশ কর্মকর্তা, বিএনপি নেতাকর্মীসহ ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

কুলিয়ারচর থানার ওসি মো. নান্নু মোল্লা জানান, কোনাপাড়া চৌমুড়ি এলাকায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তেজনা দেখা দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পুলিশ যায়। এ সময় কুলিয়ারচর থানার উপ-পরিদর্শক এহসানুল হক, আজিজুল হক ও সহকারী উপ-পরিদর্শক শীতল পাল আহত হন বলে তিনি জানান।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

'কোল্ড আর্মসে' কক্সবাজার সৈকতে দুর্ধর্ষ হামলার ছক


আরও খবর

বাংলাদেশ
'কোল্ড আর্মসে' কক্সবাজার সৈকতে দুর্ধর্ষ হামলার ছক

কমান্ডো নাইফের চালান জব্দ, তিন জঙ্গি গ্রেফতার

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাহাদাত হোসেন পরশ

দুনিয়াব্যাপী কমান্ডো নাইফ এবং বিশেষ ধরনের ছুরি ও চাকু 'কোল্ড আর্মস' হিসেবে পরিচিত। নীরব হত্যার কৌশলের অংশ হিসেবে উগ্রবাদীদের প্রায়ই কোল্ড আর্মস ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিশেষ করে সিঙ্গেল টার্গেট কিলিং মিশনে তারা এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে। বাংলাদেশেও একাধিকবার কোল্ড আর্মস ব্যবহার করে উগ্রপন্থিরা হত্যা মিশন সফল করেছে। ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর রাতে গাবতলী সেতুর কাছে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে হামলায় কোল্ড আর্মস ব্যবহার করে এএসআই ইব্রাহিম মোল্লাকে হত্যা করা হয়। ওই বছরের ৪ নভেম্বর একই ধরনের হামলায় আশুলিয়ায় নিহত হন কনস্টেবল মুকুল হোসেন। তবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কোল্ড আর্মসের চালান জব্দ করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা'আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) তিন জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৩০টি কমান্ডো নাইফসহ বেশ কিছু কোল্ড আর্মস উদ্ধার করা হয়। থার্টিফার্স্ট নাইটে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দুর্ধর্ষ হামলার ছক কষছিল তারা। এরই মধ্যে এই দলের আরও কয়েকজনকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটিটিসির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রহমত উল্লাহ চৌধুরী সমকালকে বলেন, এত সংখ্যক কোল্ড আর্মস উদ্ধারের ঘটনা এই প্রথম। থার্টিফার্স্ট নাইট ও নির্বাচন ঘিরে তারা নাশকতার ছক কষছিল। তবে পুলিশ তাদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পেয়েছে। বড় ধরনের হামলার আগে তা নস্যাৎ করার সক্ষমতা সিটিটিসির রয়েছে।

সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গ্রেফতার জেএমবির তিন জঙ্গি হলো- আব্দুল হাকিম, নোমান ও শফি। তাদের মধ্যে নোমান জেএমবির কক্সবাজার এলাকার আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল। নোমানের পদ হলো 'আসকারি'। উগ্রবাদীদের মধ্যে যারা 'সশস্ত্র যোদ্ধা' তারা আসকারি হিসেবে পরিচিত। আর শফি সাধারণ সদস্য। ২০১৩ সালে জেএমবিতে যোগ দেয় হাকিম। বর্তমানে সংগঠনটির সামরিক প্রধানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে নির্বাচন ও থার্টিফাস্র্দ্ব নাইট ঘিরে হামলার পরিকল্পনা করছিল তারা। হাকিম ও তার দুই সহযোগীর হেফাজত থেকে ফ্যাক্টরি মেইড ৩০টি কমান্ডো নাইফ, একটি বিশেষ ধরনের চাকু, দেড় কেজি বিস্ম্ফোরক, ৩০টি ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) পাওয়া গেছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিন জঙ্গি জানায়, চোরাই পথে মিয়ানমার থেকে এসব কোল্ড আর্মস তারা দেশে নিয়ে আসে। মালয়েশিয়া ও সৌদিপ্রবাসী দুই ব্যক্তি তাদের অর্থায়ন করে আসছে। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে যেভাবে জঙ্গিরা হামলা করেছে, একইভাবে থার্টিফার্স্ট নাইটে তারা কক্সবাজারে নাশকতার ছক কষছিল। মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।

একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, জেএমবির একটি অংশ কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মগজ ধোলাই করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। মানবিক সহায়তার আড়ালে তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয় রয়েছে। কক্সবাজারে গেলে হাদিসের মজলিসে অংশ নিত জেএমবির সদস্য হাকিম। সেখানে তার সঙ্গে পরিচয় হয় নোমান ও শফির। তাদের তিনজনের বাড়ি কক্সবাজারে। হাকিমের বাহ্যিক পেশা সিএনজি অটোরিকশা চালক। আর অন্য দুই জঙ্গির পেশা রাজমিস্ত্রি। আগেও অনেক দুর্ধর্ষ জঙ্গিকে অটোরিকশা চালক ও সবজি বিক্রেতার বেশে দেখা গেছে। তিন জঙ্গিকে গ্রেফতারের পর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকার জঙ্গি নেটওয়ার্ক যাতে সংগঠিত হতে না পারে, সেই তৎপরতা বাড়িয়েছে পুলিশ।

সিটিটিসির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহমেদুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতার তিন জঙ্গির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্তে কোল্ড আর্মসের এত বড় চালানের রুট ও নেপথ্য কারিগরের নাম বের করা হবে। চালান জব্দের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হয়েছে।

এর আগেও বিভিন্ন সময় গুপ্তহত্যার নীরব কৌশল-সংক্রান্ত পুস্তিকা জঙ্গিদের হেফাজত থেকে পাওয়া যায়। সেখানে দেখা গেছে, চাকুতে একটি লোহার শিকল দিয়ে দুই হাতল সংযুক্ত করে বিশেষ অস্ত্র তৈরি করার নির্দেশনা ছিল উগ্রপন্থিদের। তবে এবার তিন জেএমবি সদস্যের কাছ থেকে যে কমান্ডো নাইফ উদ্ধার করা হয়েছে, তা কাঠের বাঁটযুক্ত। একেকটি চাকু প্রায় ১০ ইঞ্চি লম্বা। প্রতিটি চাকুর মাথা অত্যন্ত সুচালো। এতে 'সেফটি অন' ও 'সেফটি অফ' গিয়ার রয়েছে। সব চাকুর জন্য রয়েছে বিশেষ ধরনের ব্যাগ। এ ছাড়া জব্দ কোল্ড আর্মসের মধ্যে এমন একটি রয়েছে, তার দু'দিক বিশেষভাবে সুচালো। এ ধরনের অত্যাধুনিক কোল্ড আর্মসের চালান দেখে গোয়েন্দারাও বিস্মিত। সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে এ ধরনের অস্ত্র ক্লোজ কমব্যাটে ব্যবহার হয়ে থাকে। জঙ্গিদের হেফাজতে এমন অস্ত্রের চালান থাকার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করছেন সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা।