বাংলাদেশ

কিশোরী ধর্ষণ-হত্যায় এক জনের মৃত্যুদণ্ড, ২ জনের যাবজ্জীবন

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৮

কিশোরী ধর্ষণ-হত্যায় এক জনের মৃত্যুদণ্ড, ২ জনের যাবজ্জীবন

  চাঁদপুর প্রতিনিধি

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার আলোচিত কিশোরী জেসমিন হত্যা মামলার আসামি সাইফুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অপর দুই আসামি মো. মিরাজ বেপারী ও নুর ইসলাম ওরফে লেদাকে যাবজ্জীবন ও ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

বুধবার দুপুরে চাঁদপুর জেলা ও দায়রা জজ মো. জুলফিকার আলী খান এ রায় দেন। হত্যার শিকার জেসমিন আক্তার ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ হরিণা গ্রামের চুন্নু মিয়ার মেয়ে।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাইফুল চাঁদপুর সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের গুলিশা গ্রামের অলিউল্যা শেখের ছেলে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মিরাজ একই উপজেলার সোবহানপুর গ্রামের চুন্নু মেম্বারের ছেলে এবং নুর ইসলাম ওরফে লেদা একই উপজেলার পূর্ব গুলিশা গ্রামের মুসলিম রাঢ়ীর ছেলে।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রাতে আসামিরা সংঘবদ্ধ হয়ে জেসমিন আক্তারকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে ফসলি জমিতে রেখে চলে যায়। পরদিন ২৬ জানুয়ারি ভোরে স্থানীয়রা মরদেহ দেখতে পেয়ে ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশকে অবহিত করে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

এ ঘটনায় ফরিদগঞ্জ থানার তৎকালীন সময়ের উপ-পরিদর্শক (এসআই) রহমান আলী বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফরিদগঞ্জ থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) নিজাম উদ্দিন তদন্ত শেষে একই বছরের ১০ মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।

সরকার পক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আমান উল্যা জানান, মামলটি প্রায় ৪ বছর আদালতে চলমান অবস্থায় ১৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্যপ্রমাণ ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালত এই রায় দেন। আসামিরা আটক হওয়ার পর জামিনে গিয়ে পলাতক রয়েছে। তাদের অনুপস্থিতিতেই এই রায় দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...


আরও খবর

বাংলাদেশ
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সমকাল প্রতিবেদক

'আমার শহীদ ভাইয়ের আত্মা ডাকে/জাগে মানুষের সুপ্ত শক্তি, হাটে মাঠে ঘাটে বাঁকে/দারুণ ক্রোধের আগুনে জ্বালবো ফেব্রুয়ারি/একুশে ফেব্রুয়ারি, একুশে ফেব্রুয়ারি।' বরেণ্য সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর 'একুশে ফেব্রুয়ারি' কবিতার শেষ ক'টি লাইনের মতোই শহীদ ভাইয়ের আত্মার ডাকে বাঙালির কোটি প্রাণ আজ ভাই হারানোর শোকে মুহ্যমান। একই সঙ্গে দ্রোহের আগুনেও বলীয়ান। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফাল্কগ্দুনের সোনাঝরা রোদ্দুরে নিজ ভাষায় কথা বলার দাবিতে, মায়ের মুখের ভাষার সম্মান প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে, প্রকাশ্য রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন বাংলার বীরসন্তানরা। রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের সেই স্মৃতিবহ মহান শহীদ দিবস, অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আজ। এদিন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। জাতির শোকাবহ, গৌরবোজ্জ্বল, অহংকারে মহিমান্বিত চিরভাস্বর দিন। সব পথ এসে আজ মিলে যাবে এক অভিন্ন গন্তব্যে- শ্রদ্ধা-ভালোবাসার শহীদ মিনারে। হাতে হাতে বসন্তের ফুলের স্তবক, কণ্ঠে চির অম্লান সেই গান 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি ..'

পৃথিবীর বুকে ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে, অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে একমাত্র বাঙালি জাতির। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই বাঙালির চেতনার প্রতীক। একুশের শহীদদের স্থান বাঙালির হৃদয়ের মর্মমূলে। অমর একুশে তাই আত্মত্যাগের অহংকারে ভাস্বর একটি দিন; জেগে ওঠার প্রেরণা। দেশমাতৃকার প্রয়োজনে আত্মোৎসর্গ করার শপথ গ্রহণের দিন।

ইতিহাসের পাতায় রক্ত পলাশ হয়ে ফোটা সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউর, আউয়াল, অহিউল্লাহর রক্তে রাঙানো অমর একুশে আজ বাঙালির দিশা, হৃদয়াপ্লুত ঐশ্বর্য, প্রাণের স্পন্দন। ১৯৫২ সালের এই দিনে শহীদদের শোণিতধারায় যে আলোকিত পথের উন্মোচন হয়েছিল, সেই পথ ধরে এসেছিল স্বাধীনতা। আজ আত্মমর্যাদায় সমুন্নত এক জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অন্তহীন প্রেরণার নাম একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশ এখন আর কেবল বাঙালির নয়, নয় শুধু বাংলাদেশের- সীমান্ত ছাড়িয়ে দিবসটি হয়ে উঠেছে বিশ্বমানবের। জাতিসংঘের সব সদস্য দেশ এই দিনে নিজ নিজ মাতৃভাষার কথা স্মরণ করে। উদযাপন করে দিবসটি।

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, 'নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অমর একুশের চেতনা অনুপ্রেরণার অবিরাম উৎস।'

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেছেন, 'একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হবে। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনে শোক, শক্তি আর গৌরবের প্রতীক।'

নানা আয়োজন, কর্মসূচি :ভাষাশহীদদের স্মরণে 'জাতীয় শহীদ দিবস' ও 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' বাংলাদেশ ও সারা বিশ্বে আজ পালিত হবে নানা আনুষ্ঠানিকতায়। রাষ্ট্রীয় আয়োজনে একুশের অনুষ্ঠানমালার সূচনা হয় বুধবার রাত ১২টা ১ মিনিটে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ-সংলগ্ন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা একুশের প্রথম প্রহরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এর পর সর্বস্তরের মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয় শহীদ মিনার।

দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে আজ সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন, রেডিও ও কমিউনিটি রেডিও দিনভর অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সড়ক দ্বীপ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো বর্ণমালা সংবলিত ফেস্টুন দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। আজ বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেছে। আজ বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৬টা থেকে সংগঠনের সব কার্যালয়ে পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। এ ছাড়া দিনভর নানা অনুষ্ঠান রয়েছে।

বিএনপি আজ বৃহস্পতিবার ভোর ৬টায় নয়াপল্টনে সারাদেশের সব কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং কালো পতাকা উত্তোলন করবে। এ ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি।

বিদেশে বাংলাদেশের সব মিশনে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযথভাবে উদযাপিত হচ্ছে।

পরের
খবর

ভাষার বিকাশে যা করণীয়


আরও খবর

বাংলাদেশ
ভাষার বিকাশে যা করণীয়

বিশেষ লেখা

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

ভাষা নিয়ে আমাদের আবেগ অনেক, কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো চিন্তা নেই, যে চিন্তা ভাষা-শিক্ষা, ভাষা ব্যবহার এবং ভাষার ক্রমাগত বিকাশে ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর নানা দেশে ভাষানীতি আছে- তাতে মাতৃভাষা শিক্ষা ও ব্যবহার নিয়ে অনেক দিকনির্দেশনা থাকে, দ্বিতীয় ও বিদেশি ভাষা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা থাকে। ২০১০ সালে আমরা একটা শিক্ষানীতি গ্রহণ করেছি, তাতে ভাষানীতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা আছে, কিন্তু শিক্ষানীতিরই যেখানে বাস্তবায়ন নেই, ভাষানীতি নিয়ে নড়াচড়ার সম্ভাবনাটা তাহলে কতটা থাকে।

আমাদের জীবনের সৃজন ও মননশীল এলাকায় সরকারের নিয়মবিধির- বিশেষ করে যেগুলো মানুষের ইচ্ছা বা প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়- পক্ষে আমি নই। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা ও ভাষা নিয়ে

আমাদের সমষ্টির চিন্তাটি দাপ্তরিক দিকনির্দেশনায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত। ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে আমাদের তরুণেরা রক্ত দিয়েছেন, ১৯৯৯ সাল থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। কাজেই মাতৃভাষা চর্চায় আমাদের সর্বোচ্চ বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই বিনিয়োগের রূপ হচ্ছে রাষ্ট্রের সদিচ্ছা থেকে নিয়ে সাংস্কৃতিক এবং আর্থিক। শিক্ষা নিয়ে আমাদের সামষ্টিক স্বপ্ন আছে, প্রত্যাশা আছে। আমরা চাই, আমাদের সন্তানরা সুশিক্ষিত হবে, আলোকিত মানুষ হবে। স্বাধীনতার পর ৪৮ বছর পার হয়ে গেছে, শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। এখন দেশে শিক্ষিতের হার ৭০ শতাংশের ঘরে। কিন্তু আমাদের সন্তানরা কি সুশিক্ষিত হচ্ছে, নিজ নিজ ক্ষেত্রে সকলেই আলো ছড়াচ্ছে? আমাদের শিক্ষায় মাতৃভাষা অবহেলিত, অনাবশ্যক কতগুলি পাবলিক পরীক্ষার চাপে শিক্ষার্থীরা কাতর ও ক্রমাগত মুখস্থবিদ্যা চর্চা এবং জিপিএ ৫ পাওয়ার অর্থহীন প্রতিযোগিতা তাদের মেধার ঘরে ঘাটতি জোগাচ্ছে। এই পাবলিক পরীক্ষাগুলির অসিলায় গ্রাম-গঞ্জে পৌঁছে গেছে কোচিং বাণিজ্য। যে শিক্ষার্থী এখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় শেষ করে বেরোচ্ছে, তার প্রধান চিন্তা সরকারি কর্মকর্তা হওয়া। তার ভাষাজ্ঞান দুর্বল। ইংরেজির কথা বাদ দিলাম, বাংলাতেই তার সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। এটি কেন হবে?

আমার একটি বিশ্বাস হচ্ছে, যে শিক্ষার্থীকে তার মাতৃভাষায় কাঙ্ক্ষিত দখলটি দিতে পারবে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি, সে অনায়াসে তার অনুরূপ দখল অন্য ভাষাতেও দেখাতে পারবে। মুশকিল হচ্ছে, আমাদের এই সময়ের শিক্ষাচিন্তা, পেশার জগৎ, সামাজিক লেনদেন, এমনকি সৃজনশীলতার নানা অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে পুঁজি এবং বাজার। এবং বাজারই নির্ধারণ করে দিয়েছে, ইংরেজিই হচ্ছে বৈশ্বিক এবং দেশীয় যোগাযোগের ও বাজারের প্রধান এবং একমাত্র ভাষা। এটি আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার মতো এই উপমহাদেশেও ঘটছে। কিন্তু আমাদের ইংরেজিতে যথেষ্ট সক্ষমতা নেই, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ইংরেজিতে কুশলতা দেখাতে পারছে না। এর একটা বড় কারণ, আমাদের মাতৃভাষা শিক্ষাতে মৌলিক কিছু দুর্বলতা। এ জন্য আমরা না মাতৃভাষায় সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করতে পারছি, না ইংরেজিতে। মাদ্রাসায় পড়ে যারা আরবি শিখছে, তাদের কজন আরবিতে কথা বলতে পারেন?

এখন সময় এসেছে মাতৃভাষা চর্চার দিকে মনোনিবেশ করা এবং সর্বোচ্চ অভিনিবেশ নিয়ে তা করা। আমি বললাম বটে- 'এখন সময় এসেছে', সময়টা আসার কথা ছিল ৪৮ বছর আগেই। যেহেতু মনোনিবেশটা তখন দিতে পারিনি- সেই ইচ্ছা বা উদ্দেশ্যও আমাদের ছিল না- তা এখনই দিতে হবে। আরও কয়েক বছর ঢিলেমি করে পার করে দিলে আমরা এতই পিছিয়ে পড়ব যে, একেবারে গোড়া থেকে শুরু করার সময় আর তখন থাকবে না।

এ জন্য প্রথমেই ভাবতে হবে, মাতৃভাষা কারা শেখাবেন, কোথায় শেখাবেন, কীভাবে শেখাবেন। আমরা জানি, মাতৃভাষা প্রথম শেখায় পরিবার, পরে বিদ্যালয়। পরিবার সব সময় সক্ষম হয় না; কিন্তু বিদ্যালয়গুলিতে সক্ষমতা থাকতেই হবে। ভালো শিক্ষকই পারেন ভালো শিক্ষা দিতে। কিন্তু ভালো শিক্ষক তৈরির জন্য, তাদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য আর্থিক বরাদ্দের প্রয়োজন। সেই বরাদ্দ বাড়াতে আমাদের শিক্ষা বাজেটকে জিডিপির অন্তত চার শতাংশে পৌঁছাতে হবে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, গ্রন্থাগার ইত্যাদিও বাড়াতে হবে। মাতৃভাষা শিক্ষার উৎকর্ষ অর্জনের জন্য শিক্ষার সার্বিক মানও বাড়াতে হবে। সে জন্য এই বরাদ্দের প্রয়োজন।

কীভাবে শেখাতে হবে মাতৃভাষা- এটি পদ্ধতির এবং কৌশলের প্রশ্ন। এ জন্যই শিক্ষানীতি প্রয়োজন। আমাদের দেশে ভাষাবিজ্ঞানী এবং ভাষাচিন্তাবিদদের অভাব নেই। তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা নিয়ে নীতিটি করে ফেলা যায়। তখন হয়তো দেখা যাবে- নতুন পাঠক্রমে, নতুন বিন্যাসে এবং কার্যকারিতার সঙ্গে শিক্ষার্থীরা একেবারে গোড়া থেকেই মাতৃভাষা শিখছে। শিক্ষানীতিই নির্দেশ করে দেবে কখন এবং কীভাবে ইংরেজি শেখা শুরু করা যায়। শিক্ষানীতি ভাষা ব্যবহারের অন্যান্য ক্ষেত্রেও উৎকর্ষের নির্দেশনা দেবে। সরকারি দপ্তরে, আদালতে (এবং উচ্চ আদালতে), করপোরেট বিশ্বে এবং মিডিয়ায় মাতৃভাষা ব্যবহারে যে দুর্বলতা, অরাজকতা এবং অনুপস্থিতি রয়েছে, তখন হয়তো তা থাকবে না।

২. তবে সকলের আগে প্রয়োজন আমাদের নিজেদের ঐকান্তিকতা ও নিষ্ঠা। আমরা যদি বুঝি যে, মাতৃভাষা ব্যবহারে আমাদের প্রচুর দুর্বলতা আছে এবং সেগুলি শোধরানো দরকার, তাহলেই না আমরা সক্রিয় হবো। আমরা যদি স্বীকার করি, 'আসলে' ও 'কিন্তু' ধরনের ঠেকা-শব্দ এবং অকারণ ইংরেজি শব্দের ব্যবহার ছাড়া আমরা একটা বাক্যও ঠিকমতো বলতে পারি না; তাহলেই না আমরা সচল হবো।

সক্রিয় এবং সচল আমাদের হতেই হবে; ভাষা ব্যবহারে আরও উন্নতি এবং উৎকর্ষের জন্য, উন্নত শিক্ষার জন্য ভাষা-শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং সর্বোচ্চ অর্জনের জন্য। বিশ্বে আমরা অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছি; এখন প্রয়োজন আমাদের সাংস্কৃতিক শক্তির পুনর্জাগরণ। ভাষা দিয়ে এটি সম্ভব। যদি শতভাগ মানুষ শিক্ষিত হয়, যদি ভাষা ব্যবহারে তারা সর্বোচ্চ সক্ষমতা অর্জন করে, যদি আঞ্চলিক ভাষাগুলি শক্তিশালী হয়, যদি আদিবাসীদের মাতৃভাষা সুরক্ষিত এবং চর্চিত হয়, তাহলে পুনর্জাগরণের শক্তি আমাদের অর্জিত হবে।

পরের
খবর

বিচারপতিদের আগ্রহ বাড়ছে


আরও খবর

বাংলাদেশ

উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহার

বিচারপতিদের আগ্রহ বাড়ছে

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আবু সালেহ রনি

উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষায় রায় ও আদেশ দেওয়ার বিষয়ে বিচারপতিদের আগ্রহ বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাইকোর্টের দু'জন বিচারপতি বাংলায় রায় ও আদেশ দিলেও গত বছর থেকে এর সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত ৯৯ জন বিচারপতির মধ্যে সাতজন কমবেশি বাংলায় রায় ও আদেশ দিয়ে আলোচনায় রয়েছেন।

তারা হলেন বিচারপতি মো. আবু তারিক, বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ, বিচারপতি ড. কাজী রেজা-উল হক, বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন, বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম। তবে তাদের মধ্যে বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন সবচেয়ে বেশিসংখ্যক রায় ও আদেশ বাংলায় লিখে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। তিনি এ পর্যন্ত আট হাজারেরও বেশি রায় বাংলায় দিয়েছেন। এরপরেই আছেন বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল। অন্য পাঁচজন বিভিন্ন ক্ষেত্রে কমবেশি বাংলায় রায় ও আদেশ দিয়েছেন।

সর্বক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন প্রণয়ন করা হয়। সংবিধানেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। তবে আজও উচ্চ আদালতে পূর্ণাঙ্গভাবে এই বিধান কার্যকর হয়নি। আদালতসহ সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে আট বছর আগে আইন কমিশন থেকেও সরকারকে সুপারিশ করা হয়েছিল।

আইনজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলা রায় ও আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারপতিদের আগ্রহ বাড়ছে; এটি অত্যন্ত ইতিবাচক। ভবিষ্যতে বাংলায় আরও বেশি রায় ও আদেশ পাওয়া যাবে বলে তারা প্রত্যাশা করেন। অনেকের মতে, ভাষাগত জটিলতা এবং বহির্বিশ্বের বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে উচ্চ আদালতের সব মামলার রায় বাংলায় দেওয়া বিচারপতিদের জন্য দুরূহ। তবে বিচারপতিরা রায় ও আদেশ দেওয়ার সময় বাংলাদেশ, মাতৃভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের বিষয়গুলোতে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের উপযোগী মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দেবেন- এমনটাও প্রত্যাশা।

আলোচিত মামলার মধ্যে সর্বশেষ বাংলায় রায় দিয়েছেন বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল। গত ১ ফেব্রুয়ারি নদী দখল-সংক্রান্ত এক আলোচিত মামলায় রায় দেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। তবে এর মধ্যে বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল মূল রায়টি বাংলায় দিয়েছেন। তিনি ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলায় হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের তৃতীয় বিচারক হিসেবে শুরু করে এখন নিয়মিতভাবে বাংলায় রায় ও আদেশ লিখে আসছেন। এর সংখ্যা ইতিমধ্যে কয়েকশ' ছাড়িয়েছে।

অন্যদিকে বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই সব আদেশ ও রায় বাংলায় দিয়ে আসছেন। বাংলায় লেখা তার উল্লেখযোগ্য রায়ের মধ্যে রয়েছে বিজিএমইএ ভবন ভাঙা, এমভি নাছরিন-২ লঞ্চডুবি ঘটনায় ক্ষতিপূরণ ও সাজা, অর্থঋণ আদালত, হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের মামলা।

সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর ৯০ দশক থেকে উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। প্রয়াত সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও বিচারপতি এম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী বাংলায় কয়েকটি আদেশ ও রায় দিয়েছিলেন; কিন্তু তা আইন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়নি। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত আইন সাময়িকীর (ঢাকা ল রিপোর্টস ৫০ ও ৫১ ডিএলআর) তথ্যানুসারে, ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক ও বিচারপতি হামিদুল হক সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ নজরুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র মামলায় বাংলায় রায় দিয়েছিলেন। একই সময়ে বিচারপতি হামিদুল হক অন্য একটি ফৌজদারি রিভিশন মামলায়ও বাংলায় রায় দেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় সাবেক বিচারপতি আবদুল কুদ্দুছ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ বাংলায় বেশ কয়েকটি রায় দিয়েছেন।

তবে তাদের মধ্যে বাংলা ভাষায় রায় দিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। তিনি বিচারপতি হিসেবে হাইকোর্টে থাকার সময় মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত স্থানসহ স্থাপনা সংরক্ষণ, স্বাধীনতার ঘোষক, ঢাকার চার নদী রক্ষাসহ প্রায় দেড়শ' উল্লেখযোগ্য মামলার রায় বাংলায় দেন। বিচারপতি খায়রুল হক বর্তমানে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলায় রায় ও আদেশ লেখা প্রসঙ্গে তিনি সমকালকে বলেন, অনেকেই বাংলা রায় ও আদেশ শুরু করেছেন। এমনটা হবে সেই ভরসাতেই বাংলায় রায় দেওয়া শুরু করেছিলাম। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের বিষয়টি তো সংবিধানেই বলা আছে। এখন দেখা যাক আগামী দিনে কীভাবে এটি কার্যকর করা হয়।

প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, যিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্টে দায়িত্ব পালনকালে একাধিক উল্লেখযোগ্য রায় বাংলায় দিয়েছিলেন। বাংলায় রায় লেখা প্রসঙ্গে বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলায় রায় দেওয়া সহজ বিষয় নয়। তবুও আশা করছি, আরও বেশিসংখ্যক বিচারপতি বাংলায় রায় ও আদেশ দেবেন। এতে অন্য বিচারপতিরাও উৎসাহী হবেন।

বাংলায় রায় ও আদেশ লেখা প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, হাইকোর্টের অনেক বিচারপতিই এখন বাংলায় রায় বা আদেশ দিচ্ছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে বাংলায় রায় দিতে তারা আগ্রহবোধ করছেন। তবে বিচারকদের জন্য বাংলায় রায় দেওয়া 'কষ্টকর' মন্তব্য করে তিনি বলেন, আদালতে ব্যবহূত বিভিন্ন দেশের মামলার রায় এবং অন্যান্য রেফারেন্স সবই ইংরেজিতে। আইনজীবীরাও ইংরেজিতে নথি উপস্থাপন করেন। তবে বার (বিচারপতি) ও বেঞ্চ (আইনজীবী) চাইলে বাংলায় রায় দেওয়া সংশ্নিষ্টদের জন্য সহজতর হয়। এ ক্ষেত্রে উভয়পক্ষের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলায় রায় লেখার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের ভূমিকা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র স্পেশাল অফিসার (অতিরিক্ত জেলা জজ) মো. সাইফুর রহমান বলেন, রায় ও আদেশ বাংলায় দিতে বিচারপতিদের কোনো আইনি বাধা নেই। তবে তারা ইংরেজি বা বাংলা কোন ভাষায় রায় দেবেন- সেটি তাদের নিজস্ব বিষয়।

এদিকে উচ্চ আদলতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে ২০১৬ সালে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছেও আবেদন করেছিলেন হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমান। এ বিষয়ে তিনি বলেন, জনস্বার্থে বিষয়টিতে নজর দিতে স্পিকারের কাছে আবেদন করেছিলাম। তিনি পরে জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে সংসদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সংসদ অধিবেশনে আলোচনা ছাড়া গত তিন বছরে বিষয়টি নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষাকে প্রাধান্য দিলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ইচ্ছা পূরণ হবে।