অন্যান্য

বানভাসি মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ

ত্রাণের জন্য হাহাকার * বাড়ছে পানিবাহিত রোগ

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

বানভাসি মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ

  সমকাল ডেস্ক

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে গত দু'দিন বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও মানুষ রয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগে। লাখ লাখ পানিবন্দি মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। ত্রাণের জন্য হাহাকার করছেন বানভাসি অভাবী মানুষ। ত্রাণবাহী কোনো নৌকা দেখলেই হামলে পড়ছেন তারা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। দুর্গম চরাঞ্চলের অনেক এলাকায় সরকারি-বেসরকারিভাবে কোনো ত্রাণই পৌঁছায়নি। বন্যার্তদের মাঝে আরও ভয়ঙ্কর দুসংবাদ নিয়ে এসেছে পানিবাহিত রোগ। ডায়রিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন শিশু ও বৃদ্ধরা। মিলছে না সুপেয় পানি ও পর্যাপ্ত ওষুধ। অনেক এলাকায় মেডিকেল টিম কাজ করলেও সংখ্যায় অনেক কম হওয়ায় সবার ভাগ্যে জুটছে না স্বাস্থ্যসেবা।

এদিকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে গতকাল শুক্রবার বন্যার পানিতে ডুবে মুন্নী খাতুন নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বানের পানিতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন সোলায়মান মণ্ডল নামে এক বৃদ্ধ। সমকালের ব্যুরো, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর-

বগুড়া :সারিয়াকান্দি পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি গতকাল বিকেল ৩টায় আট সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ১২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি কমতে শুরু করলেও বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনও সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার প্রায় ৮২ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। বানের পানি থেকে আপাতত রক্ষা পেলেও সেখানে বিশুদ্ধ পানির অভাব রয়েছে। বন্যার্তদের মাঝে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম। জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) রায়হানা ইসলাম বলেন, বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটর করা হচ্ছে। আশা করছি ত্রাণের কোনো অভাব হবে না।

গাইবান্ধা :সাদুল্যাপুর, পলাশবাড়ী ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বেশ কিছু এলাকায় বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় এখন গাইবান্ধার সাত উপজেলাই বন্যাকবলিত। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দুই পৌরসভা এবং ৩৯টি ইউনিয়নের ৩৬৩টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়ায় প্রায় ৫ লাখ মানুষ চরমে বিপাকে পড়েছেন। নতুন করে ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এখন ১৮০টি আশ্রয়কেন্দ্রে মোট আশ্রিতের সংখ্যা দাঁড়াল ৭৩ হাজার ৮০৪ জন।

সুন্দরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, উপজেলায় বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। গতকাল বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানিবন্দি পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে এ পর্যন্ত ১৪৫ টন চাল ও এক হাজার কার্টন শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। ইউএনও সোলেমান আলী জানিয়েছেন, আরও ত্রাণসামগ্রীর জন্য চাহিদা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই তা বিতরণ করা হবে।

গোবিন্দগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকালে উপজেলার মহিমাগঞ্জের বালুয়া পয়েন্টে বাঙ্গালী নদীর বাঁধ ভেঙে আশপাশের এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করে। সদ্য নেমে আসা পানিতে উপজেলার মহিমাগঞ্জের রংপুর চিনিকল শ্রমিক কলোনির মনু মিয়ার মেয়ে ৯ বছরের শিশু মুন্নী খাতুন সমবয়সীদের নিয়ে দুপুর ১২টার দিকে কলোনির পাশের খালে গোসল করতে নামে। এ সময় সে পানিতে ডুবে যায়। পরে তার লাশ ভেসে ওঠে। অন্যদিকে, দাদা-নাতিসহ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বন্যার পানির প্রবল স্রোতে তারা ভেসে যায়। স্থানীয়রা নাতি মানিককে জীবিত উদ্ধার করলেও খোঁজ মেলেনি দাদা সোলায়মান আলীর। বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার নাকাইহাট ইউনিয়নের কিসামত দুর্গাপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে আছে লক্ষাধিক মানুষ। গবাদি পশু নিয়ে কেউ কেউ রাস্তা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ না পৌঁছায় তারা অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। এসব এলাকার মানুষ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছে। ইউএনও নাজমুল হুসেইন খান বলেছেন, ইতিমধ্যে বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রানীনগর (নওগাঁ) :উপজেলার নান্দাইবাড়ী-মালঞ্চি বেড়িবাঁধ ভেঙে গতকাল ভোরে ওই এলাকার ৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাসনাত খান হাসান বলেন, বাঁধটি ৪০ বছরের, সংস্কার করা হয়নি। আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় বাঁধটি পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। এ ছাড়াও নওগাঁ-আত্রাই সড়কের বেশকিছু জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ইউএনও আল মামুন বলেন, তারা পাউবোর সহায়তায় ভেঙে যাওয়া বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা নিরূপণ করে তাদের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে।

শেরপুর :পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি গতকাল বিকেলে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সদর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে। তবে ভোগাই-সোমেশ্বরী নদীর পানি কিছুটা কমায় ঝিনাইগাতী-নালিতাবাড়ীতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙন অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে চরাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

জেলা ত্রাণ অফিস জানায়, জেলার ৫ উপজেলার ৩৭ ইউনিয়নের ১৭২ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত ৬৩ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। পাঁচ দিনে বন্যার পানিতে ডুবে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

টাঙ্গাইল :ভুঞাপুরের টেপিবাড়ী এলাকায় ভুঞাপুর-তারাকান্দি বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে বাঁধটি ভেঙে যাওয়ায় টাঙ্গাইলের সঙ্গে তারাকান্দি ও সরিষাবাড়ির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে বাঁধটি মেরামতে কাজ করছে সেনাবাহিনী। এদিকে বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

নাটোর :সিংড়ায় পানির স্রোতে বক্তারপুর ব্রিজ ভেঙে উপজেলা সদরের সঙ্গে অন্তত ৩০ গ্রামের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইউএনও সুশান্ত কুমার মহাতো বলেন, খবর পেয়ে তিনি এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। ব্রিজটি প্রায় ৬০ বছর আগে নির্মিত। এ কারণে একদিকে হেলে পড়েছে। বর্ষা শেষে নতুন করে ব্রিজটি নির্মাণ করা হবে।

ওসমানীনগর (সিলেট) :গত দু'দিন বৃষ্টি না হওয়ায় কুশিয়ারা নদীর শেরপুর পয়েন্টে প্রায় ১৩ সেন্টিমিটার পানি হ্রাস পেয়েছে। তবে পুরোপুরি বন্যামুক্ত হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উপজেলার সাদীপুর, উমরপুর, পশ্চিম পৈলনপুর, বুরুঙ্গা ও গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের সহস্রাধিক পরিবারের বসতঘরে পানি রয়েছে। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ইউএনও আনিছুর রহমান জানান, বন্যার্তদের মাঝে ২৯ টন চাল ও একশ' প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) :জগন্নাথপুরে পানি ধীরে ধীরে কমছে। তবে দুর্ভোগ কমছে না দুর্গত মানুষের।

নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৪০ গ্রামের লোকজন এখনও পানিবন্দি রয়েছেন। পানিতে তলিয়ে গেছে অসংখ্য গ্রামীণ রাস্তাঘাট। ইউএনওর দায়িত্বে থাকা এসিল্যান্ড ইয়াসির আরাফাত বলেন, দু'দিনে ধরে আবহাওয়া ভালো থাকায় গতকাল থেকে পানি কমছে।

মন্তব্য


অন্যান্য