পরিবেশ

শকুন সচেতনতা দিবস আজ

পরিবেশের বন্ধুরা কি হারিয়েই যাবে

১৯৯০ সালে ছিল ১০ লাখ, এখন মাত্র ২৬০

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরিবেশের বন্ধুরা কি হারিয়েই যাবে

  জয়নাল আবেদীন

লোকে বলে, শকুনের দোয়ায় গরু মরে না। তবে গরুর মাংস খেয়েই পৃথিবী থেকে বিদায়ের পথে শকুনের বংশ। একসময় স্পষ্ট বোঝা গেল যে, গরুর দেহে প্রয়োগ করা ওষুধের কারণেই প্রকৃতির 'পরিচ্ছন্নতাকর্মী' মারা পড়ছে। তবে ততক্ষণে শকুনের সংখ্যা এতই নিচে নেমে গেছে যে, গোটা বিশ্ব উঠেপড়ে লাগার পরও পরিস্থিতির আর উন্নতি হচ্ছে না।

তিন দশক আগে বাংলাদেশের আকাশে ১০ লাখ শকুন উড়ত। এরপর কমতে কমতে তা এখন মাত্র ২৬০-এ নেমে এসেছে। মূলত ১৯৯০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যেই ৯৯ শতাংশ শকুন হারিয়ে গেছে দেশ থেকে।

গত কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দেশের নানা প্রান্তে হঠাৎ করে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে বিরল প্রজাতির বিশালাকার একটি পাখি। স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে তাকে বেঁধে রাখে। অনেকেই জানে না তার পরিচয়। বৃত্তান্ত জানতে ছবি তুলে ছড়িয়ে দেয় ফেসবুকে। পরে কোনো এক বিশেষজ্ঞ বুঝতে পারেন যে, এটি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পর্যায়ে থাকা পরিযায়ী পাখি শকুন। বন বিভাগের লোকজন উদ্ধার অভিযানে নামার আগেই ওড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে আহত অসুস্থ পাখিটি। অনেকের আর আকাশে ওড়াই হয় না।

বিস্ময়কর তথ্য হলো, লোকের ছোড়া পাথরে শকুনের মৃত্যুর ঘটনাও আছে। এমনকি লোকালয়ে ধরা পড়ার পর হিংস্র মানুষের থাবায় প্রাণও হারিয়েছে শকুন। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ শকুনই লোকালয়ে নেমে আসে শীতকালে। আর ওভাবে তাদের মুখ থুবড়ে পড়ার প্রধান কারণ শক্তিহীনতা। খাদ্যের চরম সংকটে অসুস্থ হয়ে হারিয়ে ফেলে ওড়ার ক্ষমতা। একে একে অসুস্থ শকুন ধপাস করে পড়ে, যেন সঙ্গে সঙ্গেই দেশের আকাশ থেকে মুখ থুবড়ে পড়েছে এই পাখির বংশ। বাংলাদেশে এখন মাত্র ছয় জাতের শকুনের দেখা মেলে।

প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জোট আইইউসিএনের গবেষক সীমান্ত দীপু সমকালকে বলেন, বাংলাদেশে এক সময় রাজ শকুনের রাজত্ব ছিল। প্রায় ৪০ বছর হলো সেটি বিলুপ্ত হয়েছে। তিনি বলেন, শকুনের সংখ্যা বাড়াতে আইইউসিএন বন অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। ইতিমধ্যে দেশে দুটি জোন ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি বছর অন্তত ১০ থেকে ১২টি শকুন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শকুনের অবিশ্বাস্য গতিতে হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রথম নজরে আসে ১৯৯২ সালে। গবেষকরা মাঠে নেমে পড়েন। শুরু হয় কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা। দ্রুত বিলুপ্তির রহস্য উন্মোচনে লেগে যায় ১১ বছর। গবাদি পশুর শরীরে তখন ডাইক্লোফেনাক ওষুধ প্রয়োগ করা হতো। মৃত গরুর মাংসই শকুনের প্রধান খাদ্য। তাই এ ধরনের পশু মারা গেলে সেটিই হয়ে উঠত শকুনের বংশ নির্মূলের প্রধান নিয়ামক।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক ড. লিন্ডসে প্রমাণ করেন, ডাইক্লোফেনাক প্রয়োগ করা গরুর মাংস খাওয়ার তিন মিনিটের মধ্যে শকুনের মৃত্যু হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আগেই পৃথিবীর আকাশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শকুন হারিয়ে যায়। এমনকি এ তথ্য জানার পরও বাংলাদেশে ওষুধটি নিষিদ্ধে লেগে যায় দীর্ঘ সময়।

শকুন বিলুপ্তির পেছনে রাসায়নিকই একমাত্র কারণ নয়। কীটনাশক ও সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পানির দূষণ, খাদ্য সংকট, কবিরাজি ওষুধ তৈরিতে শকুনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার, ইউরিক অ্যাসিডের প্রভাবে বিভিন্ন রোগ ও বাসস্থানের অভাবকেও দায়ী করছে আইইউসিএন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশ ভারতে ছয়টি শকুন প্রজননকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে গত কয়েক বছরে। বাংলাদেশেও শকুনের সংখ্যা বাড়াতে দুটি নিরাপদ জোন ঘোষণা করে সরকার। কিন্তু উল্লেখযোগ্য হারে সংখ্যাটি বাড়ছে না।

এদিকে, শকুনকে অনেকে 'ভবঘুরে' আখ্যা দিলেও তাতে আপত্তি বন্যপ্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপুর। তার মতে, শকুনরা দলবেঁধে খাবারের সন্ধানে ৩২ হাজার বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত ঘোরে। এ জন্য লোকমুখে ভবঘুরে শব্দটি শোনা যায়। আসলে তা নয়। সাধারণত বট, পাকুড়, অশ্বত্থ, ডুমুরসহ বড় গাছগুলোতে বাসা বাঁধে শকুন। তিনি বলেন, একদল শকুন একটি বড় মরা গরু সাবাড় করতে মাত্র ২০ মিনিট সময় নেয়। এরা ছোট ছোট টুকরো হাড় আস্ত গিলে ফেলে। রোগের সংক্রমণ ছড়ানোর আগেই মৃত প্রাণী খেয়ে খুব সহজে হজম করে ফেলতে পারে এই ঝাড়ূদার পাখি।

বন অধিদপ্তর জানায়, ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর শকুনের জন্য দুটি নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করে সরকার। এর আয়তন ৪৭ হাজার ৩৮০ বর্গকিলোমিটার। সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, কুমিল্লা ও খাগড়াছড়ির মোট ১৯ হাজার ৬৬৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার সমন্বয়ে গঠিত এক নম্বর নিরাপদ জোন। দ্বিতীয় জোনের আয়তন ২৭ হাজার ৭১৭ বর্গকিলোমিটার। এটি গঠিত হয় ফরিদপুর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, মাদারীপুর, যশোর, গোপালগঞ্জ (টুঙ্গিপাড়া ব্যতীত), নড়াইল, শরীয়তপুর, বরিশাল, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর (ভাণ্ডারিয়া ব্যতীত) ঝালকাঠি, পটুয়াখালী ও বরগুনার সমন্বয়ে। এগুলোর মধ্যে লাউয়াছড়া, সাতছড়ি, খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, মাধবকুণ্ড, টিলাগড়, বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক এবং কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান, সুন্দরবন (পূর্ব-পশ্চিম-দক্ষিণ), সোনারচর, টেংরাগিরি, চাঁদপাই, দুখমুখী, ঢাংমারী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যকে শকুনের জন্য সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে সরকার।

শীতকালে খাবারের সন্ধানে নেমেই বিপদে :গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সিরাজগঞ্জের তাড়াশে চরকুশাবাড়ী পশ্চিমপাড়ায় নজিবুর রহমানের বাড়ির উঠানে পড়ে একটি শকুন। বাড়িওয়ালা ধরে রশি দিয়ে বেঁধে তাকে খাবার দেন। গত ১৫ ডিসেম্বর রায়গঞ্জের সাহেবঘাটায় এবং ১৯ এপ্রিল পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় একটি জমিতে পড়ে যায় শকুন।

২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের সাতনালা ইউনিয়নের কয়েকটি স্থানে চারটি শকুন আহত অবস্থায় পড়ে যায়। চারটিই মারাত্মক অসুস্থ ছিল। এ জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার শতগ্রাম ইউনিয়নে আরও দুটি হিমালয়ান শকুন আহত অবস্থায় পড়ে ২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর।

নীলফামারীর জলঢাকায় ২০১৭ সালের ১৮ নভেম্বর, ডিমলায় ২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এবং ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর কিশোরীগঞ্জে তিনটি শকুন জমিতে লুটিয়ে পড়ে। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে দুটি এবং ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরের বনগ্রামে একটি শকুন পায় স্থানীয়রা।

২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের চিলাবাড়ি গ্রামে একটি শকুন মাটিতে পড়ে গেলে স্থানীয় এক গৃহবধূ সেটি লালন-পালন শুরু করেন। প্রায় তিন মাস তিনি এটিকে পালনের পর বনবিভাগ নিয়ে যায়।

২০১১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় রহমতাবাদ গ্রামে একটি শকুন উদ্ধার করে ৯ দিন ধরে বেঁধে রাখে স্থানীয় লোকজন। পরে বনবিভাগ সেটি উদ্ধার করলেও মারাত্মক অসুস্থ শকুনটিকে বাঁচানো যায়নি।

সীমান্ত দীপু সমকালকে বলেন, হিমালয় থেকে শীতকালে দেড়শ'র মতো শকুন বাংলাদেশে আসে। প্রবল শীতের কারণে ওখানে খাবার পায় না। সেখানকার গাছগাছালিতে ঘেরা বিরাট ফোকরে তারা ডিম রেখে আসে। ছানারা শীত-গ্রীষ্ফ্ম সবকালেই বাঁচা শেখে। মা-বাবা নীলফামারী, পঞ্চগড়, দিনাজপুরের দিকে খাবারের সন্ধানে নামে। তবে খাবার এখন খুব কম পায়। দুর্বল শরীরে ওড়ার শক্তি হারিয়ে ওরা মাটিতে পড়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ শকুন সচেতন নয়। গ্রামাঞ্চলে এখনও শকুন নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। ফলে শকুন মানুষের হিংস্রতার শিকার হয়। এ বিষয়ে সচেতনতাও বাড়ানো উচিত।

মন্তব্য


অন্যান্য