পরিবেশ

ঢাকার প্রাচীন বৃক্ষ

বিজ্ঞান কলেজের জংলিবাদাম

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিজ্ঞান কলেজের জংলিবাদাম

  মোকারম হোসেন

চারশ' বছর উদযাপন করেছে ঢাকা শহর, বেশি দিন আগের কথা নয়। কিন্তু এই শহরে চারশ' বছর তো দূরের কথা, দুইশ' বছরের পুরনো বৃক্ষও খুঁজে পাওয়া দুস্কর। দীর্ঘ পরাধীনতা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসচেতনতা এবং মাত্রাতিরিক্ত ভোগবাদী মানসিকতায় এখানকার অনেক ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রাচীন বৃক্ষসম্পদও হারিয়ে গেছে। এ কারণে আমরা সন্ধান করেছি মাত্র শতবর্ষী বা শতোর্ধ্ববর্ষী বৃক্ষগুলোর। এমন বৃক্ষের সংখ্যাও হাতেগোনা কয়েকটি।

তেজগাঁও সরকারি বিজ্ঞান কলেজের গেট লাগোয়া বিশালাকৃতির জংলিবাদাম গাছটি শতোর্ধ্ববর্ষী। গাছটির উচ্চতা, কাণ্ড ও ডালপালার বিস্তৃতি দেখেই বয়স অনুমান করা যায়। তবে গাছটি কে, কখন লাগিয়েছিলেন সে সম্পর্কে এখন আর কোনো ঐতিহাসিক সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। ফুটপাত লাগোয়া দেয়ালের ভেতর গাছটির বেশ চওড়া কাণ্ড দেখা যায়। চারপাশে  সুপরিসরে বিস্তৃত অসংখ্য ডালপালার বিস্তারই গাছটির পরিণত বয়স জানান দিচ্ছে। মোটা কাণ্ডের এই গাছে প্রতি বছরই নির্দিষ্ট সময়ে ফুল ও ফল আসে। জংলিবাদাম (ঝঃবৎপঁষরধ ভড়বঃরফধ) বেশ আকর্ষণীয় গড়নের একটি গাছ। কোথাও কোথাও বক্সবাদাম বা উদালবাদাম নামেও পরিচিত।

জংলিবাদামের গাছ, ফুল ও ফল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এ গাছের সঙ্গে শিমুলের সাদৃশ্য স্পষ্ট। উন্নত দেহভঙ্গি, শাখাবিন্যাস এবং পাতার গড়নে গাছ দুটি প্রায় অভিন্ন। নরম কাণ্ডের এই গাছ পত্রমোচি, ৩৫ থেকে ৪০ মিটারের মতো উঁচু হতে পারে। কাণ্ড খাড়া, বাকলের রঙ ধুসর বা সাদাটে ও মসৃণ।

পাতা পুরু, করতলাকৃতি, যৌগিক, ৫ থেকে ১০ পত্রক, উপবৃত্তাকার বা বল্লমাকার এবং উপপত্র তুরপুন আকৃতির। ১২৫ থেকে ২৩০ মিমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। শীতে গাছের সব পাতা ঝরে যায়। পাতা ছোট ছোট শাখান্তে একান্তভাবে ঘনবিন্যস্ত থাকায় গাছটি ছায়ানিবিড়।

বসন্তের শুরুতেই গাছের শাখান্তে প্রস্টম্ফুটনের প্লাবন আসে এবং ঔজ্জ্বল্য ও প্রাচুর্যে তা অনেকটাই শিমুলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। জংলিবাদামের শাখায়িত প্রান্তিক মঞ্জরি বহুপৌষ্পিক ও বর্ণোজ্জ্বল। নিষ্পত্র পুষ্পিত এ গাছের বর্ণাঢ্যতা সমকালীন প্রস্টম্ফুটিত অন্য গাছে অনুপস্থিত। কিন্তু সব সৌন্দর্য ছাপিয়ে ওঠে উৎকট, উগ্র, দূরবাহী ও দীর্ঘস্থায়ী দুর্গন্ধ। দুর্গন্ধ যাদের প্রিয় সেই মাছিরাই জংলিবাদামের অন্তরঙ্গ সহযোগী। এ ফুলের পাপড়ি নেই। পাপড়ি বলে যাদের ভুল করা সম্ভব তা আসলে রঙিন বৃতি। পাঁচ অংশে গভীরভাবে বিভক্ত এই বৃতির বর্ণবৈচিত্র্য আকর্ষণীয় :লাল-হলুদ ও বেগুনিতে মেশানো এই রঙ প্রখর। বাদামের ফল গুচ্ছবদ্ধ। প্রতি গুচ্ছে ফলসংখ্যা এক থেকে পাঁচ। ফল মুষ্টি কিংবা নৌকা আকৃতির অত্যন্ত কঠিন আবরণযুক্ত এবং রঙের দিক থেকে হালকা রক্তিম। ভাজা বীজ চীনাবাদামের স্বাদযুক্ত ও খাদ্য হিসেবে উপাদেয়। কাঁচা বীজ বমনোদ্রেককারী।

বাকল থেকে দড়ির আঁশ মেলে। কাঠ নরম ও মূল্যহীন। বীজ-তৈল রেচক ও বায়ুদোষনাশক। জংলিবাদামের আদি আবাস নিরক্ষীয় আফ্রিকা থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।

মন্তব্য


অন্যান্য