পরিবেশ

অগ্রাধিকার খাত ৬ পরিবেশ ও জলবায়ু

উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে

বিশেষ সাক্ষাৎকার : ড. আইনুন নিশাত

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে

  শেখ রোকন

পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেছেন, নতুন করে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান অবকাঠামোগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণকে 'বলিষ্ঠ পদক্ষেপ' আখ্যা দেন। সমকালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শীর্ষস্থানীয় এই জলবায়ু বিজ্ঞানী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় বাংলাদেশের উপকূলরেখা বরাবর সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলায় বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে। আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনি অববাহিকাভিত্তিক সুফল বণ্টনের ওপর জোর দিতে বলেন। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বদলে হিমালয় অঞ্চলে নেপাল, ভুটান ও ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে বলেন বর্তমান সরকারের নতুন মেয়াদে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে নৌপথ পুনরুদ্ধারে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আইনুন নিশাত সমকালকে বলেছেন, টানা দুই মেয়াদেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নদী ব্যবস্থাপনায় বিশেষ মনোযোগ দিয়ে এসেছে। এবারের ইশতেহারে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে দেশের ছোট নদীগুলো প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বেদখল হয়ে গেছে অনেক নদী। বড় নদীগুলোর দুই তীর ভেঙে অস্বাভাবিক চওড়া হয়েছে ও গভীরতা ক্রমেই কমছে। আগামী মেয়াদে জোর দিতে হবে নদী ব্যবস্থাপনার দিকে। সেক্ষেত্রে ড্রেজিং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু খনন নয়, এর মাধ্যমে ভূমি উদ্ধারের বিষয়টি  বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।

আইনুন নিশাত মনে করেন, গত দুই মেয়াদে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে বৃহৎ পরিকল্পনাগুলো সরকারের বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের প্রমাণ। বিশেষ করে পদ্মা সেতু প্রকল্প রীতিমত 'দুঃসাহসিক'। নিজস্ব অর্থায়নের এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন মেয়াদে সরকার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকেও অগ্রাধিকারে রাখতে পারে। তিনি মনে করেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে যেসব ২০-২৫ ফুট ড্রাফটের সামুদ্রিক জাহাজ ভিড়তে পারে, তা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভূমিকা রাখা কঠিন। যে লক্ষ্য নিয়ে পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হয়েছে, তা অর্জনে জোর দিতে হবে।

অধ্যাপক নিশাত মনে করেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ বিষয়ে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৮-ক ধারা যুক্ত করা। এতে বলা হয়েছে- দেশের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বনভূমি ইত্যাদি রক্ষায় রাষ্ট্র দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে নীতিগত দিক থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে। গতানুগতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষায় নজর দেওয়া এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তব্য। তিনি প্রত্যাশা করেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে, সেখানে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রতিবেশ ব্যবস্থার সংঘাত এড়ানো হবে। সরকারের নতুন মেয়াদের শুরুতেই তিনি সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশলপত্র প্রণয়নের ওপর জোর দেন। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে উন্নয়ন কাঠামোর সব ক্ষেত্রেই সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল মেনে চলা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের জন্য এক অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু অনিবার্য বাস্তবতা। বৈশ্বিক এই দুর্যোগের কারণে আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, প্লাবন, খরা, নদীভাঙন, অস্বাভাবিক জোয়ারের তীব্রতা, মাত্রা ও পরম্পরা তিনটিই বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ইতিমধ্যে জটিল আকার ধারণ করেছে। অনেক অধিবাসীই মিঠাপানির অভাবে দেশান্তরী হওয়ার কথা ভাবছে। আওয়ামী লীগের ইশতেহারে লবণাক্ততা রোধ করার কথা বলায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, আগামীতে বিভিন্ন দুর্যোগ বিশেষত জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ও তীব্রতা বাড়বে। এজন্য উপকূলরেখাব্যাপী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

নদীভাঙনের পাশাপাশি সমুদ্র ও নদীর মোহনায় নতুন নতুন চর জেগে উঠছে। নদী ও পানি বিষয়ে দেশে-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করা এই পানি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জেগে ওঠা নতুন চরগুলোকেও স্থিতিশীল করে তোলায় জোর দিতে হবে। তার মতে, এই লক্ষ্য পূরণে একটি সহজ উপায় হচ্ছে সব চরেই বনায়ন। কিন্তু বনায়নের সঙ্গে সঙ্গে যদি জনবসতি স্থাপিত হতে থাকে, তাহলে বনায়ন টেকসই হবে না। উপকূলে জেগে ওঠা চরে বনায়ন ও বসতির ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দেন আইনুন নিশাত।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রথমবারের মতো 'ডেল্টা প্ল্যান ২১০০' বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন- ডেল্টা প্ল্যান বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা মূলত পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পানি সম্পদের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এসবের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে এই দলিল প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, ইশতেহারে ডেল্টা প্ল্যানের উল্লেখ এ ব্যাপারে সরকারের চিন্তা-ভাবনার গুরুত্ব নির্দেশ করছে। তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্নিষ্টদের ধারণা আরও স্পষ্ট থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

আইনুন নিশাত বলেন, গত পাঁচ দশকে দেশে ইতিমধ্যে নানা পরিকল্পনার অধীনে ছোট-বড় শত শত অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। ডেল্টা প্ল্যানের অধীনে নতুন নতুন বৃহদাকার অবকাঠামো নির্মাণের আগে ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। কারণ, অনেক অবকাঠামোই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না। সমকালের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন, পরিবেশ ও পানিসম্পদ সংক্রান্ত কিছু প্রকল্প ও অবকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, পানিসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন টেকসই হবে না।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এ ধরনের বড় প্রকল্পের প্রয়োজন আছে বলে আইনুন নিশাত মনে করেন। তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নীতিগত, কারিগরি ও প্রায়োগিক পর্যায়ে উপযুক্ত বিশেষজ্ঞদের নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে হবে। তিনি মনে করেন, পানি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা ও দূরদৃষ্টি কাজে লাগাতে হবে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানিসম্পদ বিষয়ে অধ্যাপক আইনুন নিশাত মনে করেন, অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুই দেশ ইতিমধ্যে একমত হয়েছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময়ই এ ব্যাপারে সমঝোতা হয়। কিন্তু গত সাত বছরে এর বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। তিনি মনে করেন, এই সমঝোতার অধীনেই অভিন্ন নদীগুলোর উজানে পার্বত্য অঞ্চলে ড্যাম নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অভিন্ন নদীর অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ সেসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করে উৎপন্ন জলবিদ্যুতের একটি অংশ পেতে পারে। প্রয়োজনে অন্যান্য দেশের অংশ থেকেও কিনে নিতে পারে।

ভারত-বাংলাদেশে অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের তাগিদ দেন ড. নিশাত। তিনি বলেন, বিশেষভাবে সমন্বয় করতে হবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মধ্যে।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত শিক্ষায় জোর দেওয়া উচিত বলে আইনুন নিশাত মনে করেন। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও বেশি সংখ্যক তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানী প্রয়োজন। তিনি বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত শিক্ষার মানোন্নয়ন সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের সঙ্গেই জড়িত।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

হাওরে পাখি নেই আগের মতো


আরও খবর

পরিবেশ
হাওরে পাখি নেই আগের মতো

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মুরাদ মৃধা, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

একসময় শীত এলেই পরিযায়ী পাখির কলরবে মুখর হতো নাসিরনগরের মেদীর হাওর। পাখির অভয়াশ্রম হিসেবেই লোকমুখে পরিচিত ছিল এ হাওর। ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখির আগমনে মৌসুমি বিনোদন পেত স্থানীয়রা। পাখির কলতান উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকেও আসতেন পাখিপ্রেমী মানুষ। বছর ঘুরে এখন শীত আসে ঠিকই; কিন্তু আগের মতো আসে না অতিথি পাখি। শুধু নাসিরনগরই নয়, চার-পাঁচ বছর ধরে সব হাওরেই কমে গেছে পরিযায়ী পাখির আনাগোনা।

পাখি বিশেষজ্ঞ ও সংশ্নিষ্টরা বলছেন, পাখির আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্য সংকট ও জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের ফলে দিন দিন পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমছে। পাশাপাশি হাওরে নতুন নতুন চর পড়ায় হাওর হারিয়েছে তার স্বাভাবিক পরিবেশ। উপরন্তু, মাছ কমে যাওয়ায় পাখির আনাগোনাও কমে গেছে। এ ছাড়া হাওরসহ আশপাশে পাখির আবাসস্থল তৈরিতে স্থানীয় বা সরকারিভাবে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় হাওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অতিথি পাখিরা।

তাদের অভিমত, হাওরের স্যাঁতসেঁতে কাদাপানিতে ছোট মাছ, শামুকসহ পাখিদের প্রাকৃতিক খাবারের নানা উৎস থাকায় সেখানে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে বালিহাঁস, পানকৌড়ি, সাদা বক, রামকুড়া, পিয়ারী, শামুককৌড়ি, ল্যাঞ্জা হাঁস, কালো হাঁস, কুড়া, চখাচখি, চাতক, চিত্রা শালিক, ডুবুরি পাখি, দেশি মেটে হাঁস, ধলাটুপি পাঁয়রা, নিশি বক, পাতি তিলিহাঁস, বালু নাকুটি প্রভৃতি নানা প্রজাতির দেশি-বিদেশি পাখি দলবেঁধে ছুটে আসত। সেই চেনা দৃশ্য আজ আর দেখাই যায় না।

সারা পৃথিবীতে বাসরত প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখির মধ্যে এক হাজার ৮৫৫ প্রজাতির পাখি পরিযায়ী বা যাযাবর স্বভাবের। অর্থাৎ ১৯ শতাংশ প্রজাতির পাখি সমগ্র বিশ্বের কোথাও না কোথাও ভ্রমণ করে। এর মধ্যে প্রায় ২৩০ প্রজাতির পাখি পরিযায়ন করে আসে বাংলাদেশে। দেশি এবং পরিযায়ী মিলিয়ে বাংলাদেশে বিচরণ করে প্রায় ৬০০ প্রজাতির পাখি (তথ্যসূত্র : ড. রেজা খান, বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী, দ্বিতীয় খণ্ড)।

৩৩১ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে নাসিরনগর উপজেলা। এর উত্তরে হবিগঞ্জ জেলার লাখাই ও কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলা। দক্ষিণ-পূর্বদিকে মাধবপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা। আর পশ্চিমে মেঘনা নদী। জেলা সদর থেকে নাসিরনগরের দূরত্ব প্রায় ২৮ কিলোমিটার। জেলার উত্তরে অবস্থিত এ হাওরবেষ্টিত নাসিরনগর অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকা। মেঘনা নদীর শাখা গিয়ে মিলিত হয়েছে নাসিরনগরের মেদীর হাওরের লঙ্গন, বলভদ্র, কচরাবিল, আঠাউরি, খাস্তি ও চিকনদিয়া উপনদীর সঙ্গে। এখানে

বেশ কিছু হাওর, বিল ও মরা নদী রয়েছে। এগুলোর মধ্যে পরিযায়ী পাখির জন্য মেদীর হাওরই বিখ্যাত।

সরেজমিন দেখা যায়, এসব নদ-নদী ও খাল-বিলের আশপাশে গত কয়েক বছরে পরিবেশ আইনকে তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠেছে জনবসতি ও ইটভাটা। উপজেলার সবচেয়ে বড় বিল আঠাউরি গিয়ে কথা হয় জেলে তাপস দাস ও রবি দাসের সঙ্গে। তারা জানান, হাওরে উঁচু জমিতে সবাই এখন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত। তাই পাখি নিরাপদে থাকতে পারছে না। সে জন্য অতিথি পাখির উপস্থিতি কমে গেছে। তাদের মতে, হাওরে প্রচুর লোকসমাগম থাকে বলে পাখি আসে কম।

নাসিরনগরের ভিটাডুবি গ্রামের জেলে অনিল দাস বলেন, 'সবকিছুই তো দিন দিন কমতাছে। আমরা যহন ছোড আছিলাম তহন দেখছি, গাছের ওপরে বইয়্যা পাখিগুলা ডিম পাড়ত; কিন্তু বড় বড় গাছ সব কাইট্টা লাইছে, হের লাইগ্যা পাখি অহন আর ডিম পাড়তে আয়ে না। মানুষের ভয়েও অহন আর পাখি আমরার বিলে আয়ে না। এই বিলে আগে রাজ্যের মাছ পাওয়া যাইত, কিন্তু অহন নাই। মাছ যিমুন হারাইছে, পাখিও হারাই গ্যাছেগা।'

হাওর লাগোয়া স্থানীয় বালিখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহিনুর রহমান বলেন, হাওরের পরিবেশ আর আগের মতো নেই। তাই পরিযায়ী পাখির পরিমাণ প্রতিবছরই কমছে।

নাসিরনগরের এ হাওর নিয়ে গবেষণার কাজে বেশ কয়েকবার এখানে এসেছিলেন পাখি বিশেষজ্ঞ শরীফ খান। মোবাইল ফোনে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, পরিযায়ী পাখিরা হাওরের জলে ভেসে ভেসে ফসল সাবাড় করলেও ওরা প্রতিদিন সেখানেই প্রচুর বিষ্ঠা ত্যাগ করে। ফলে যে কোনো ধরনের ফসলের গাছগাছালির জৈব সারের চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। অন্যদিকে মাছগুলো পাচ্ছে ওদের উপযুক্ত খাবার। এতে ফসলের গাছ যেমন দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তেমনি মাছেরও ওজন বাড়ে দ্রুত। এত উপকার করেও পাখিরা মানুষের হিংস্র থাবা থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। খাদ্যের সন্ধানে এসে পাখিরা নিজেরাই খাদ্যে পরিণত হচ্ছে। অথচ এসব দেখার যেন কেউ নেই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মাধব দীপ প্রতিবছরই হাওরে আসেন পাখি দেখতে। কিছুদিন আগে এসে শীতের পাখি দেখতে না পেয়ে হতাশ তিনি। দুঃখ করে বলেন, আমি এ এলাকারই ছেলে। ছোটবেলা আমরা দলবেঁধে হাওরে পাখি দেখতে আসতাম। গত কয়েক বছরে পরিযায়ী পাখির অনুপস্থিতি এটাই জানান দিচ্ছে যে, এখানকার জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। তিনি বলেন, যে বিলজুড়ে আগে পাখি নামত, সেখানে এখন মানুষ কৃত্রিমভাবে মাছ চাষ করছে। পাখি আসবে কীভাবে?

এদিকে, পরিযায়ী পাখির জন্য অনুকূল পরিবেশ না থাকার কথা বলেছেন খোদ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুমন ভৌমিক। তিনি বলেন, পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় কয়েক বছর ধরে হাওরে পাখি কমছে। আমরা চেষ্টা করছি নানা উদ্যোগ নিতে। আশা করি, আবারও পাখি ফিরে আসবে আগের মতোই।

নাসিরনগর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অঞ্জন কুমার দেব বলেন, হাওরে এখন আগের মতো পাখিশিকারি নেই। তবে পরিযায়ী পাখির জন্য হুমকি হতে পারে এমন সব কার্যক্রম বন্ধে উপজেলা প্রশাসন সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে।

নাসিরনগর সরকারি কলেজের জীববিজ্ঞানের শিক্ষক জিয়া উদ্দিন বলেন, হাওর, খাল-বিল, জলাশয় থেকে নির্বিচারে পরিবেশবান্ধব শামুক-ঝিনুক নিধন করার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি মাছের পরিমাণ যেমন কমছে, কমছে পাখিও। তিনি বলেন, শামুক-ঝিনুক হচ্ছে প্রাকৃতিক ফিল্টার। এগুলো মরে গিয়ে মাংস ও খোলস পচে জমির মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশ তৈরি করে। এতে পাখির জলজ খাবার তৈরি হয়। শামুক-ঝিনুকের অভাবে দেশি মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে দেশি মাছসহ নানা প্রজাতির জলজ প্রাণি ও পাখির প্রাকৃতিক খাবারের উৎস।

স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, পরিযায়ী পাখি আমাদের দেশের জন্য আশীর্বাদ। এসব পাখি আমাদের প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করছে। তাই উপযুক্ত পরিবেশ সুরক্ষায় প্রশাসনের অচিরেই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

পরের
খবর

দিনাজপুরে প্রাণিখেকো উদ্ভিদ


আরও খবর

পরিবেশ
দিনাজপুরে প্রাণিখেকো উদ্ভিদ

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর

প্রাণীদের খেয়ে ফেলে- এমন উদ্ভিদের কথা রূপকথার গল্পে আছে, বাস্তবেও আছে; তবে সত্যিসত্যি তেমন উদ্ভিদ খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু বিরল সেই উদ্ভিদের সন্ধান পেয়েছে দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ। গাছটিকে খুঁজে পাওয়া গেছে কলেজেরই ক্যাম্পাসে। উদ্ভিদটি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন ছাত্রছাত্রীরা।

দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন জানান, এক বীজপত্রী মাংসাশী এ উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নামDrosera Rotundifolia যাকে বাংলায় বলা হয় 'সূর্যশিশির'। মাংসাশী উদ্ভিদের মধ্যে এই প্রজাতি সবচেয়ে বড়। ৪-৫ সেন্টিমিটার ব্যাস বিশিষ্ট গোলাকার থ্যালাসসদৃশ উদ্ভিদটির মধ্য থেকে একটি লাল বর্ণের ২-৩ ইঞ্চি লম্বা পুষ্পমঞ্জরি হয়। ১৫-২০টি তিন থেকে চার স্তরের পাতাসদৃশ মাংসল দেহের চারদিকে পিন আকৃতির কাঁটা থাকে। মাংসল দেহের মধ্যভাগ অনেকটা চামচের মতো ঢালু এবং পাতাগুলোতে মিউসিলেজ সাবস্ট্যান্স নামের একরকমের এনজাইম (আঠা) বের হয়। সুগন্ধে ও উজ্জ্বলতায় আকৃষ্ট হয়ে পোকা বা পতঙ্গ উদ্ভিদটিতে পড়লে এনজাইমে আটকে যায়। এ সময় পতঙ্গ নড়াচড়া করলেই মাংসল পাতার চারদিকের পিনগুলো বেঁকে পোকার শরীরকে বিদ্ধ করে আটকে ফেলে। এভাবে এ উদ্ভিদটি পোকা বা পতঙ্গ খেয়ে থাকে।

গত ১৫ জানুয়ারি দিনাজপুর সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসের উত্তর দিকের পরিত্যক্ত ভূমিতে এ উদ্ভিদগুলো শনাক্ত করা হয় বলে জানান সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন। তিনি জানান, মাংসাশী বা পতঙ্গখেকো এই উদ্ভিদের ইংরেজি নাম Sundews। এটি Caryophyllales বর্গ এবং Droseraceae গোত্রভুক্ত। কলসপত্রী ও পাতাঝাঝি নামে এ গোত্রের আরও দুই সদস্য রয়েছে।

কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের এমএসসি শেষ পর্বের ছাত্র মোসাদ্দেক হোসেন জানান, ২০১৬ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের জীববিজ্ঞান গ্যালারিতে ঘুরে দেখার সময় জেনেছিলেন, সূর্যশিশির নামের এমন একটি উদ্ভিদ এ দেশে শুধু দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলেই জন্মায়। এরপর তিনি বিভিন্ন স্থানে এ উদ্ভিদটি খোঁজার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত গত ১৫ জানুয়ারি বিভাগের শিক্ষকদের সহায়তায় কলেজ ক্যাম্পাসেই সূর্যশিশিরের সন্ধান পান তিনি। এর ফলে নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন, একটি উদ্ভিদ কীভাবে পোকা খায়। এ বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এ উদ্ভিদটি পেয়ে এটি নিয়ে হাতেকলমে কাজ করার একটি বিরল সুযোগ সৃষ্টি হলো।

একই কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী হাফিজা ইসলাম হ্যাপী জানান, নিজেদের ক্যাম্পাসে পতঙ্গখেকো এই উদ্ভিদের সন্ধান পেয়ে তারা গর্ববোধ করছেন।

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. ফিরোজ জানান, এ এলাকায় বিলুপ্তপ্রায় এমন একটি গাছ পাওয়ায় উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্য নিয়ে জ্ঞানার্জন অনেক সহজ হবে।

পিএইচডি গবেষণারত কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবুল হোসেন জানান, সূর্যশিশিরকে সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, এর আগে বাংলাদেশে এই উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা হয়নি। এটিকে রক্ষা ও গবেষণা করা সংশ্নিষ্ট সবার দায়িত্ব। কীভাবে এটি কপি ও সংরক্ষণ করা যায়, তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে। এর টিস্যু নিয়ে কাজ করা যাবে বলেও মনে হচ্ছে। এই উদ্ভিদটি প্রোটিন হিসেবে পোকামাকড় খায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর আগে দেশের অন্য কোথাও এমন উদ্ভিদের সন্ধান মেলেনি বলেও জানান তিনি।