পরিবেশ

অগ্রাধিকার খাত ৬ পরিবেশ ও জলবায়ু

উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে

বিশেষ সাক্ষাৎকার : ড. আইনুন নিশাত

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে

  শেখ রোকন

পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেছেন, নতুন করে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান অবকাঠামোগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণকে 'বলিষ্ঠ পদক্ষেপ' আখ্যা দেন। সমকালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শীর্ষস্থানীয় এই জলবায়ু বিজ্ঞানী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় বাংলাদেশের উপকূলরেখা বরাবর সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলায় বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে। আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনি অববাহিকাভিত্তিক সুফল বণ্টনের ওপর জোর দিতে বলেন। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বদলে হিমালয় অঞ্চলে নেপাল, ভুটান ও ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে বলেন বর্তমান সরকারের নতুন মেয়াদে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে নৌপথ পুনরুদ্ধারে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আইনুন নিশাত সমকালকে বলেছেন, টানা দুই মেয়াদেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নদী ব্যবস্থাপনায় বিশেষ মনোযোগ দিয়ে এসেছে। এবারের ইশতেহারে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে দেশের ছোট নদীগুলো প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বেদখল হয়ে গেছে অনেক নদী। বড় নদীগুলোর দুই তীর ভেঙে অস্বাভাবিক চওড়া হয়েছে ও গভীরতা ক্রমেই কমছে। আগামী মেয়াদে জোর দিতে হবে নদী ব্যবস্থাপনার দিকে। সেক্ষেত্রে ড্রেজিং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু খনন নয়, এর মাধ্যমে ভূমি উদ্ধারের বিষয়টি  বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।

আইনুন নিশাত মনে করেন, গত দুই মেয়াদে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে বৃহৎ পরিকল্পনাগুলো সরকারের বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের প্রমাণ। বিশেষ করে পদ্মা সেতু প্রকল্প রীতিমত 'দুঃসাহসিক'। নিজস্ব অর্থায়নের এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন মেয়াদে সরকার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকেও অগ্রাধিকারে রাখতে পারে। তিনি মনে করেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে যেসব ২০-২৫ ফুট ড্রাফটের সামুদ্রিক জাহাজ ভিড়তে পারে, তা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভূমিকা রাখা কঠিন। যে লক্ষ্য নিয়ে পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হয়েছে, তা অর্জনে জোর দিতে হবে।

অধ্যাপক নিশাত মনে করেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ বিষয়ে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৮-ক ধারা যুক্ত করা। এতে বলা হয়েছে- দেশের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বনভূমি ইত্যাদি রক্ষায় রাষ্ট্র দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে নীতিগত দিক থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে। গতানুগতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষায় নজর দেওয়া এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তব্য। তিনি প্রত্যাশা করেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে, সেখানে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রতিবেশ ব্যবস্থার সংঘাত এড়ানো হবে। সরকারের নতুন মেয়াদের শুরুতেই তিনি সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশলপত্র প্রণয়নের ওপর জোর দেন। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে উন্নয়ন কাঠামোর সব ক্ষেত্রেই সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল মেনে চলা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের জন্য এক অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু অনিবার্য বাস্তবতা। বৈশ্বিক এই দুর্যোগের কারণে আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, প্লাবন, খরা, নদীভাঙন, অস্বাভাবিক জোয়ারের তীব্রতা, মাত্রা ও পরম্পরা তিনটিই বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ইতিমধ্যে জটিল আকার ধারণ করেছে। অনেক অধিবাসীই মিঠাপানির অভাবে দেশান্তরী হওয়ার কথা ভাবছে। আওয়ামী লীগের ইশতেহারে লবণাক্ততা রোধ করার কথা বলায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, আগামীতে বিভিন্ন দুর্যোগ বিশেষত জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ও তীব্রতা বাড়বে। এজন্য উপকূলরেখাব্যাপী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

নদীভাঙনের পাশাপাশি সমুদ্র ও নদীর মোহনায় নতুন নতুন চর জেগে উঠছে। নদী ও পানি বিষয়ে দেশে-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করা এই পানি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জেগে ওঠা নতুন চরগুলোকেও স্থিতিশীল করে তোলায় জোর দিতে হবে। তার মতে, এই লক্ষ্য পূরণে একটি সহজ উপায় হচ্ছে সব চরেই বনায়ন। কিন্তু বনায়নের সঙ্গে সঙ্গে যদি জনবসতি স্থাপিত হতে থাকে, তাহলে বনায়ন টেকসই হবে না। উপকূলে জেগে ওঠা চরে বনায়ন ও বসতির ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দেন আইনুন নিশাত।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রথমবারের মতো 'ডেল্টা প্ল্যান ২১০০' বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন- ডেল্টা প্ল্যান বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা মূলত পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পানি সম্পদের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এসবের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে এই দলিল প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, ইশতেহারে ডেল্টা প্ল্যানের উল্লেখ এ ব্যাপারে সরকারের চিন্তা-ভাবনার গুরুত্ব নির্দেশ করছে। তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্নিষ্টদের ধারণা আরও স্পষ্ট থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

আইনুন নিশাত বলেন, গত পাঁচ দশকে দেশে ইতিমধ্যে নানা পরিকল্পনার অধীনে ছোট-বড় শত শত অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। ডেল্টা প্ল্যানের অধীনে নতুন নতুন বৃহদাকার অবকাঠামো নির্মাণের আগে ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। কারণ, অনেক অবকাঠামোই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না। সমকালের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন, পরিবেশ ও পানিসম্পদ সংক্রান্ত কিছু প্রকল্প ও অবকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, পানিসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন টেকসই হবে না।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এ ধরনের বড় প্রকল্পের প্রয়োজন আছে বলে আইনুন নিশাত মনে করেন। তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নীতিগত, কারিগরি ও প্রায়োগিক পর্যায়ে উপযুক্ত বিশেষজ্ঞদের নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে হবে। তিনি মনে করেন, পানি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা ও দূরদৃষ্টি কাজে লাগাতে হবে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানিসম্পদ বিষয়ে অধ্যাপক আইনুন নিশাত মনে করেন, অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুই দেশ ইতিমধ্যে একমত হয়েছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময়ই এ ব্যাপারে সমঝোতা হয়। কিন্তু গত সাত বছরে এর বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। তিনি মনে করেন, এই সমঝোতার অধীনেই অভিন্ন নদীগুলোর উজানে পার্বত্য অঞ্চলে ড্যাম নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অভিন্ন নদীর অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ সেসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করে উৎপন্ন জলবিদ্যুতের একটি অংশ পেতে পারে। প্রয়োজনে অন্যান্য দেশের অংশ থেকেও কিনে নিতে পারে।

ভারত-বাংলাদেশে অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের তাগিদ দেন ড. নিশাত। তিনি বলেন, বিশেষভাবে সমন্বয় করতে হবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মধ্যে।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত শিক্ষায় জোর দেওয়া উচিত বলে আইনুন নিশাত মনে করেন। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও বেশি সংখ্যক তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানী প্রয়োজন। তিনি বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত শিক্ষার মানোন্নয়ন সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের সঙ্গেই জড়িত।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

বছরে বাতাসে ছড়াচ্ছে ১৪ হাজার কেজি পারদ


আরও খবর

পরিবেশ

ফাইল ছবি

  সমকাল প্রতিবেদক

প্রতিবছর বাতাসে ছড়াচ্ছে ১৪ হাজার ৭৭২ কেজি পারদ, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। 

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর লালমাটিয়ায় এসডো কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে 'মার্কারি অ্যাডেড প্রোডাক্ট অ্যান্ড অ্যাভেইলেবল অলটারনেটিভস ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। 

এতে বলা হয়, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ফ্লুরোসেন্ট বাতি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, অলঙ্কার ও প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহারের পর উন্মুক্ত পরিবেশে ফেলা হয়। এসব বর্জ্য থেকে বাতাসে পারদ ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে বিভিন্ন বর্জ্য থেকে ছড়ানো পারদ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সচিব এসডোর চেয়ারপারসন সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ, বিএসটিআইর রাসায়নিক বিভাগের চেয়ারম্যান এসডোর নির্বাহী সদস্য অধ্যাপক ড. আবুল হাশেম, এসডোর মহাসচিব ড. শাহারিয়ার হোসেন প্রমুখ।

পরের
খবর

সরকারি প্রতিষ্ঠানের দূষণে মরছে বংশী


আরও খবর

পরিবেশ

নদীকৃত্য দিবস আজ

সরকারি প্রতিষ্ঠানের দূষণে মরছে বংশী

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলতাব হোসেন, ঢাকা গোবিন্দ আচার্য্য, সাভার

ঢাকার আশপাশে চারটি নদী। তার একটি বংশী। সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ডিইপিজেড) পরিশোধিত তরল শিল্পবর্জ্যে মরছে এই নদীটি। দূষণের জন্য ডিইপিজেড ৮০ শতাংশ এবং অন্য ১৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ২০ শতাংশ দায়ী। আর ৮২ জন দখলদারের নাম চিহ্নিত করা হয়েছে। শিগগির শুরু হচ্ছে দখল-দূষণের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও পরিবেশ অধিদপ্তর সরেজমিন দখল ও দূষণকারী চিহ্নিত করে তৈরি করেছে প্রতিবেদনটি। এখানে ৮২ ব্যক্তি ও ১৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। নদী দখলদারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা সমিতি, সাভার বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি, আওয়ামী লীগ নেতা, শিল্পপতি ও জনপ্রতিনিধির নাম রয়েছে।

নদীর দূষণ বন্ধে কিছু সুপারিশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রতিবেদনটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন তারা। শিগগির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হবে এটি। তার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- জামালপুর জেলার পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপত্তি হয়ে দক্ষিণে টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলা হয়ে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বংশী নদী। শিল্পবর্জ্য ও দখল-দূষণে মৃতপ্রায় এটি। শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের দূষণে  এর পানি কালচে রঙ ধারণ করেছে। ইজারা ছাড়াই ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে ড্রেজার দিয়ে। নদীর দু'পাশের তীর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। দু'পাড়ে সমানতালে চলছে দখল ও ভরাট। নির্মাণ করা হচ্ছে স্থাপনা। সাভার থানাঘাট থেকে নামাবাজার, বাঁশপট্টি পৌরসভার বর্জ্য ফেলে ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বড় বড় দালান। বংশী নদীর ওপর নির্মিত সাভার-ধামরাই সেতুর দু'পাশে দখল করে রেখেছেন প্রভাবশালীরা। নয়ারহাট এলাকায়ও নদী দখলের ভয়াবহ চিত্র চোখে পড়ে। নদীর পূর্ব-পশ্চিম দু'পাশের তীর ঘেঁষে ব্যবসায়ীরা মাটি দিয়ে নদী ভরাট করে বালুর ব্যবসা করছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সরেজমিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ডিইপিজেড) বংশী নদী দূষণের জন্য ৮০ শতাংশ আর অন্য ১৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ২০ শতাংশ দায়ী। প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, বংশী নদীকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে ডিইপিজেডের তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য স্থাপিত সিইটিপি পরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে নির্গমন করা যাবে না। যথাযথ তরল বর্জ্য রি-সাইক্লিং ও জিরো ডিসচার্জ প্ল্যান প্রণয়ন এবং শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্য ১৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বংশী নদীকে বাঁচাতে শিগগির উচ্ছেদ অভিযান ও দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে দূষণের জন্য জরিমানা আদায় করতে হবে।

দূষণের জন্য অভিযুক্ত ১৪ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- বাংলাদেশ ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ, ঝুমকা টেক্সটাইল, বেলকুচি নিটিং, ডেনিটেক্স, মুসলিম ওয়াশিং, এইচআর টেক্সটাইল, আনলিমা টেক্সটাইল, জি কিউ ইন্ডাস্ট্রিজ, আবেদীন টেক্সটাইল, এফকেএন মিলস, গ্রাফিক টেক্সটাইল, ইমাকুলেট টেক্সটাইল, বেইজ পেপার মিল, পার্ল পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস। এসব শিল্প-কারখানার পরিবেশ ছাড়পত্র ও ইটিপি আছে। অভিযোগ আছে- ইটিপি থাকলেও সার্বক্ষণিক তা চালু রাখা হয় না। কারখানার দূষিত বর্জ্য বংশী নদীতে ফেলা হয়।

বংশী নদীর সঙ্গে ঢাকার আশপাশের অন্যান্য নদীর পানির প্রবাহ থাকায় দূষণ ঢাকার অন্যান্য নদীতেও ছড়িয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খালেদ হাসান সমকালকে বলেন, 'পরিবেশ অধিদপ্তর বংশী নদীর দূষণ নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সরেজমিন প্রতিবেদনে দখল ও দূষণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে এতে।'

এক সময়ের প্রমত্তা বংশী নদী দূষণ ও দখলের কারণে সরু খালে পরিণত হয়েছে। নদীটির মরণদশার কারণে নদীতীরবর্তী সেচব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। নদীতীরবর্তী যেসব মানুষ নদীকে কেন্দ্র করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতেন, নদীটির মরণদশায় তারা এখন দীর্ঘদিনের পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন। গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও ধামরাই অংশে নদীটি বেশি দখল ও দূষণের শিকার হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সাভারের নয়ারহাট থেকে শহীদ রফিক সেতু পর্যন্ত বংশী নদীর প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় দখল এবং অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে নির্গমন করা হচ্ছে। কালো পানির উৎকট দুর্গন্ধে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্যসহ জনজীবন। সাভার থানা সংলগ্ন নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে প্রায় পাঁচ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা আবাসন প্রকল্প। সাভার নামাবাজার এলাকায় দেখা গেছে, নদীর তীর দখল করে কয়েকশ' পাকা ও আধাপাকা বসতবাড়ি ও দোকানপাটের মতো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। নদীর তীর দখল করে ইট, খোয়া, বালু ফেলে ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠেছে।

সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এম শামসুল হক বলেন, 'দখলের কারণে সাভারের অন্তত ১২টি খাল বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে মরতে বসেছে বংশী নদী।'

নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম ঠান্ডু মোল্লা বলেন, 'উপজেলার পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ দেওয়ান নয়ারহাট এলাকায় বংশী নদী দখল করে দোকান বরাদ্দ দিয়েছেন।'

সম্প্রতি সাভারের স্থানীয় এনজিও ভার্ক মিলনায়তনে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), নিজেরা করি এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) যৌথ উদ্যোগে নদী রক্ষায় স্থানীয়দের নিয়ে একটি যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বলা হয়, বংশী নদী ও তুরাগ নদ অব্যাহত দখল-দূষণের ফলে সাভার এখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দখল আর দূষণে বংশী এখন আর নদী নয়, একটি সরু খাল হয়ে গেছে। তুরাগের চেয়েও খারাপ অবস্থা বংশীর। প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, নদী ও জলাশয় ভরাট করা যাবে না। তারপরও ভরাট হচ্ছে।'

এ বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার সমকালকে বলেন, সম্প্রতি বংশী নদী সরেজমিন পরিদর্শন করে একটি রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে আমার নেতৃত্বে। নদীর দখল-দূষণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠান ও দখলদারদের নামের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বংশী নদী বাঁচাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বংশী, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গাকে একসঙ্গে লিংক করে সরকারের ডেল্টা প্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করলে আগামীর ঢাকার জন্য বড় কাজ হবে তা।

পরের
খবর

বনাঞ্চলের গাছ কাটায় নিষেধাজ্ঞা


আরও খবর

পরিবেশ

ছবি: ফাইল

  সমকাল প্রতিবেদক

দেশের সব ধরনের বনাঞ্চল ও বনভূমি থেকে গাছ কাটার ওপর ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিল সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সোমবার এ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

একই সঙ্গে প্রকল্পের নামে দেশের সব বনাঞ্চল ও বনভূমি থেকে গাছ কাটা বন্ধ করতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে সরকারের সংশ্নিষ্টদের প্রতি রুল জারি করেন আদালত। এ ছাড়া প্রতিটি প্রকল্পের গাছ কাটা ও লাগানোর সময় নির্ধারণ সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে আগামী ছয় মাসের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও সাইদ আহমেদ কবির। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান।

রিটকারী আইনজীবী সাইদ আহমেদ কবির জানান, গণমাধ্যমে গাছ কেটে মহেশখালীতে তেলের ডিপো নির্মাণ, কাপাসিয়ায় বন কেটে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ, মানিকগঞ্জে গাছ কেটে সড়ক নির্মাণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ হয়। ওই প্রতিবেদনের পর বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) পক্ষ থেকে সংশ্নিষ্টদের কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গত ৫ মার্চ হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত এ আদেশ দেন।

সংশ্লিষ্ট খবর