এশিয়া

এই প্রতাপ সেই প্রতাপ

প্রকাশ : ০১ জুন ২০১৯

এই প্রতাপ সেই প্রতাপ

মন্ত্রীসভার শপথে (বাঁয়ে) ও কুঁড়েঘর থেকে বের হয়ে আসছেন রতাপ চন্দ্র সারাঙ্গি- সংগৃহীত

  অনলাইন ডেস্ক

লোকসভা নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছেন নরেন্দ্র মোদি। এরই মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকারে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া এক রাজনীতিক নেতাকে নিয়ে চলছে ব্যাপক চর্চা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নায়ক হয়েছেন তিনি।

কুঁড়েঘর থেকে মন্ত্রণালয়ে ঠাঁই পাওয়া প্রতাপ চন্দ্র সারাঙ্গিকে নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্যই বেশি এসেছে। তবে সাদামাটা এই মন্ত্রীকে নিয়ে ইতিবাচকের বাইরেও নেতিবাচক সমালোচনাও শুরু হয়েছে এবার। একে একে বেরিয়ে আসছে তার পেছনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। বিবিসির এক প্রতিবেদেন উঠে এসেছে এসব প্রসঙ্গ।

বৃহস্পতিবার যখন ভারতের নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিচ্ছিল, তখন সবচেয়ে বেশি করতালি পড়েছিল প্রায় অপরিচিত, দেখতে শীর্ণকায় একজন মন্ত্রীর ক্ষেত্রে। তার নাম প্রতাপ। নিজের রাজ্য উড়িষ্যার বাইরে তাকে খুব কম মানুষই চেনেন। কিন্তু গত সপ্তাহে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন।

একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাওয়ার জন্য একেবারে সাধারণ পোশাকে তিনি তার বেড়ার কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন। কপর্দকহীন অবস্থা থেকে বিপুল বিত্তশালী হওয়ার কাহিনী ভারতে সবসময় সাড়া জাগায়। কাজেই সারাঙ্গির কাহিনীও সেরকম তোলপাড় সৃষ্টি করলো।

সদ্য জনপ্রিয়তা পাওয়া এই প্রতাপ চন্দ্র সারাঙ্গি আসলে কে? খোঁজ নিয়ে জানা যায় সারাঙ্গির অতীত ইতিহাস অতটা স্বস্তিকর নয়।

১৯৯৯ সালে ভারতে একজন খ্রিষ্টান মিশনারি গ্রাহাম স্টেইনস এবং তার দুই সন্তান খুন হন উন্মত্ত হিন্দু জনতার হাতে। ভারতের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতারা এই হত্যাকাণ্ডৈর জন্য দায়ী করেন কট্টরপন্থী হিন্দু গোষ্ঠী বজরং দলকে। প্রতাপ চন্দ্র সারাঙ্গি তখন এই বজরং দলের নেতা। তবে সরকারি তদন্তে ওই ঘটনার সঙ্গে কোন একটি গোষ্ঠীর সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

২০০৩ সালে দীর্ঘ বিচার শেষে এই ঘটনায় মোট ১৩ জনকে সাজা দেওয়া হয়। তাদের একজন দারা সিং ছিলেন বজরং দলের সদস্য। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। উড়িষ্যার হাইকোর্ট দুইবছর পর অবশ্য তার মৃত্যুদণ্ড রদ করে দেয়। সেই সঙ্গে আরও ১১ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামীকে মুক্তি দেয় আদালত। কারণ তাদের সাজা দেয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সারাঙ্গি তখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন খ্রিস্টান মিশনারীরা পুরো ভারতকে ধর্মান্তরিত করার শয়তানি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। যারা তখন সারাঙ্গির সাক্ষাৎকার নেন তাদের একজন ছিলেন উড়িষ্যার সাংবাদিক সন্দীপ সাহু।

সেই সাক্ষাৎকারে সারাঙ্গি যদিও খ্রিস্টান মিশনারী গ্রাহাম স্টেইনস এবং তার দুই সন্তানকে হত্যার নিন্দা করেন, ধর্মান্তরের বিরুদ্ধে তিনি তার শক্ত দৃষ্টিভঙ্গীতে অনড় ছিলেন।

২০০২ সালে বজরং দলসহ ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলো উড়িষ্যা রাজ্য বিধান সভায় হামলা চালায়। এই ঘটনায় সারাঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অগ্নিসংযোগ, হামলা এবং সরকারি সম্পদের ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়।

সারাঙ্গিকে মন্ত্রী করার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে যে মাতামাতি, সেখানে অবশ্য এর কোেও কিছুর উল্লেখ নেই। বরং তিনি কত 'সাধাসিধে' জীবনযাপন করেন সেটাই সবাই উল্লেখ করছেন।

সন্দীপ সাহু জানান, সারাঙ্গি তার এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার জন্য সাইকেলে চড়ে ঘুরে বেড়ান। ভুবনেশ্বরেও প্রায়শই তাকে দেখা যায় পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে চড়ে রাজ্য পরিষদের সভায় যাচ্ছেন। রাস্তার ধারের কোনও সাধারণ খাবার দোকানে খাচ্ছেন। রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন।

সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনে যখন সারাঙ্গি তার দুই বিত্তশালী ও ক্ষমতাবান প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেন, তখন সেই লড়াইকে ডেডিড বনাম গোলিয়াথের লড়াই বলে তুলনা করা হয়।

বৃহস্পতিবার যখন তিনি মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন তার নির্বাচনী এলাকায় উৎসব শুরু হয়ে যায়। সমর্থকরা আতশবাজি পুড়িয়ে এবং মিষ্টি বিতরণ করে তাদের উল্লাস প্রকাশ করেন। কেউ কেউ তাকে এরই মধ্যে 'উড়িষ্যার মোদি' বলে বর্ণনা করতে শুরু করেছেন।

বিবিসি বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা তারকা বনে যাচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রে এটাই সমস্যা। কোন একটা ছবি বা কোন একজনের গল্প সেখানে মূহুর্তেই ভাইরাল হয়ে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করছে। এর ফলে কোন ব্যক্তি অতীতে কী করেছেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনেই তাকে লোকজন নায়কে পরিণত করছে।

মন্তব্য


অন্যান্য