বিশ্লেষণ

লোকসভার ল.সা.গু. এবং বিজেপির বরাত

প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৯ | আপডেট : ১৯ মে ২০১৯

লোকসভার ল.সা.গু. এবং বিজেপির বরাত

রোববার ভারতে লোকসভা নির্বাচনের শেষ ধাপে ভোটগ্রহণ চলছে। উত্তর প্রদেশের বারানসীর একটি ভোটকেন্দ্র থেকে তোলা ছবি— এএফপি

  শেখ রোকন

আর সামান্য সময় পরেই ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সপ্তম বা শেষ দফার ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম গত পাঁচ সপ্তাহে যে 'এক্সিট পোল' বা বুথ ফেরত ভোটারদের মধ্যে জরিপ চালিয়েছে, তার ফল ঘোষণা করতে থাকবে। সকাল যেমন দিনের আভাস দেয়, তেমনই এক্সিট পোলে পাওয়া যায় ফলাফলের আভাস। তারও আগে দেখা যাক, ভোটের অঙ্ক কী বলে।

ভারতে রাজ্যের সংখ্যা ২৯ হলেও লোকসভা নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখে মূলত ৫টি রাজ্য– উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও তামিলনাড়ু। লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে এগুলোতেই ২৪৯। গুরুত্বপূর্ণ এই পাঁচ রাজ্যের দুইটিতে বর্তমানে বিজেপি সরকার– উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্র। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও তামিলনাড়ুতে যথাক্রমে তৃণমূল কংগ্রেস, জেডিইউ, এআইএডিএমকে।

এসব রাজ্যে বিজেপি এবার ভালো করবে, খোদ দলটিরই কেউ বুক ঠুকে দাবি করতে পারছে না। বিরোধীরা বরং আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। বিহারে বিজেপির জোটসঙ্গী নিতিশ কুমার নিজের আসন নালন্দাতেই হেরে যেতে পারেন। উত্তর প্রদেশে সপা-বসপা জোট যোগী আদিত্যনাথের ধ্যান ভেঙে দিয়েছে। মোদি-অমিত জুটি উত্তরপ্রদেশের লোকসান পুষিয়ে নিতে হপ্তায় হপ্তায় পশ্চিমবঙ্গের আনাচে-কানাচে হাজিরা দিয়েছেন। কোথায় যেন দেখলাম নরেন্দ্র মোদি এক পশ্চিমবঙ্গে একাই ১৭টি সমাবেশ করেছেন।

'টপ ফাইভ' রাজ্যের পর লোকসভা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ অন্য পাঁচ রাজ হচ্ছে– মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, গুজরাট, অন্ধ্র প্রদেশ ও রাজস্থান। এই রাজ্যগুলোতে রয়েছে লোকসভার ১৩৮ আসন। এর মধ্যে শুধু গুজরাটে বিজেপি সরকার। মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে কংগ্রেস এবং কর্ণাটকে জেডিএস-কংগ্রেস জোট। অন্ধ্র প্রদেশে টিডিপি।

নরেন্দ্র মোদির উত্থান ঘটেছে গুজরাট থেকে সত্য। কিন্তু উস দিন গুজার গ্যয়া। সর্বশেষ বিধান সভা নির্বাচনে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে, গুজরাটের গদি প্রায় উল্টে গিয়েছিল। বিজেপি যেখানে ৯৯, কংগ্রেস সেখানে ৭৭ আসন পেয়েছে। ১৯৯৫ সালে ক্ষমতা হারানোর পর এটাই কংগ্রেসের সর্বোচ্চ আসন। গত দেড় বছরে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিজেপির আরও বিপক্ষে গেছে।

অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু লোকসভা নির্বাচনের শেষ দফা ভোটের আগেই জোট গঠনে মাঠে নেমে গেছেন। বলাবাহুল্য, বিজেপি বিরোধী জোট গঠন কেবল নয়, তার নজর কিছু এনডিএ শরিক বা 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট' দলগুলোর দিকেও।

দ্বিতীয় ব্লকের বাকি চার রাজ্যের তিনটিতে কংগ্রেস একক বা জোটগতভাবে ক্ষমতায়। লোকসভা নির্বাচনের মাত্র তিন মাস আগে, গত ডিসেম্বরে, এগুলোতে ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস। লোকসভা নির্বাচনেও সেই জোয়ার অব্যাহত থাকবে মনে হচ্ছে।

ওপরের দশটি রাজ্য মিলে মোট আসন ৩৮৭। ম্যাজিক সংখ্যা ২৭২ থেকে শতাধিক ওপরে। পরিস্থিতি যেমন, এর মধ্যে বিজেপি অর্ধেক আসনও নিজের ঝুলিতে পুরতে পারবে? সন্দেহ রয়েছে।

আরও পাঁচটি রাজ্যের কথা যদি ধরি– ওড়িশা, কেরালা, তেলাঙ্গানা, ঝাড়খণ্ড ও আসাম। এখানে রয়েছে লোকসভার ৮৬টি আসন। স্বীকার করতে হবে, এর মধ্যে ঝাড়খণ্ড ও আসামে বিজেপি শক্তিশালী। ১৪ দুগুণে ২৮ আসনে। তেলাঙ্গানা রাজ্যে ক্ষমতায় টিআরএস। এর নেতা চন্দ্রশেখর রাও এখনও কোনো জোটে যাননি। লোকসভা নির্বাচনে নিশ্চয়ই তার দল ভালো করবে এবং কেন্দ্রে যেদিকে বৃষ্টি, সেদিকে ছাতা ধরবেন। রাজ্য হিসেবে তেলাঙ্গানায় টিআরএসের একচ্ছত্র আধিপত্য। আর বিজেপির অবস্থা কংগ্রেসের চেয়ও খারাপ।

১৫ রাজ্যের তিন ব্লকের আসন সংখ্যা যদি হিসাব করি, একুনে (২৪৯+১৩৮+৮৬) ৪৭৩। বাকি ১৪ রাজ্য মিলে মাত্র ৭০। সেগুলো সব বিজেপি নিয়ে নিলেও কাজ হবে না। সেখানেও ভাগ আছে অবশ্য। যেমন ছত্তিসগড়ের ১১ আসন। মাত্র গত ডিসেম্বরে সেখানে বিজেপি হঠিয়ে কংগ্রেস রাজ্য ক্ষমতায় এসেছে।

সীমান্তের এপাশ থেকে পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, বিজেপিকে এখন অপেক্ষা করতে হবে 'অলৌকিক' কিছুর জন্য। সেই আশাতেই শেষ দফা ভোটের আগের দিন নরেন্দ্র মোদি কেদারনাথের গুহায় ধ্যান করতে গেছেন সম্ভবত। যদিও ছবি তোলার বাহার দেখে এই ধ্যানের আধ্যাত্মিকতা নিয়ে ধন্দ লাগে।


লেখক ও গবেষক
skrokon@gmail.com

মন্তব্য


অন্যান্য