বিশ্লেষণ

বিএনপির শপথ কিংবা উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ

প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০১৯ | আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০১৯

বিএনপির শপথ কিংবা উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ

  শেখ রোকন

ঐক্যফ্রন্ট তো বটেই, বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও যে শেষ পর্যন্ত শপথ নেবেন- এ ব্যাপারে কারও কি সন্দেহ ছিল? একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর শপথের নির্ধারিত ৯০ দিনের শেষ দুপুর পর্যন্ত দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাই বলুক, পাড়ার চায়ের দোকানের আলোচকরাও এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। শুধু একজনই সম্ভবত ব্যতিক্রম ছিলেন। গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু। ওই দলের মনোনয়নে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর এবং মোকাব্বির খানের শপথ নেওয়ার পর তাদের বহিস্কারে মন্টু উঠেপড়ে লেগেছিলেন। দলের দুই সংসদ সদস্যের প্রতি হম্বিতম্বিতে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন শতভাগ নিশ্চিত। জোটসঙ্গী বিএনপির কেউ সংসদে যাচ্ছে না। আজকের সন্ধ্যায় তার 'অনুভূতি' জানতে খুব ইচ্ছা হয়।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সঙ্গত কারণেই শপথের ব্যাপারে প্রথম থেকেই দলীয় অবস্থান সমুন্নত রাখতে চেয়েছেন। শেষ দিন পর্যন্ত দৃশ্যত চেষ্টা চালিয়েছেন, বিএনপি থেকে নির্বাচিত এমপিরা যাতে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ না নেন। যদিও ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের জাহিদুর রহমান জাহিদ শপথ নেওয়ার পরই বোঝা যাচ্ছিল, আগের সেই ঝাঁঝ নেই। বহিস্কারের ঘোষণা দেওয়ার বদলে জাহিদের ওপর 'সরকারের চাপ' থাকার কথা বলেছিলেন। প্রথম 'বিচ্যুতি' নিজের জেলা থেকে আসা তার জন্য এতটাই বিব্রতকর ছিল যে, সেদিন বাসা থেকেই বের হননি ফখরুল। আজ, সোমবার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরও চার নির্বাচিত সংসদ সদস্য শপথ নেওয়ার পর তিনি জানিয়েছেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের নির্দেশনাতেই তারা সংসদে গেছেন। এও জানা গেছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম নিজেও শপথ নেবেন। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সময় বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে চিঠিও চলে গেছে বলে সংবাদমাধ্যমের খবর।

এই 'নির্দেশনা' ছাড়া আর কোনো উপায়ও কি ছিল বিএনপির সামনে? জাহিদুর রহমানের শপথের পর বাকিদের আটকাতে দলটির পক্ষে সম্ভাব্য সবরকম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দলীয় কার্যালয়ে ডেকে এনে 'ওয়াদা' করানো, উচ্চতম পর্যায় থেকে দফায় দফায় ফোন, বহিস্কারের ভয় দেখানো- সবই করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে এমন খবরও এসেছে- চারজন যদি শপথ নেন, তাহলে নিজেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবারের জন্যও বিএনপির দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আমার ধারণা, শেষ পর্যন্ত বাগ মানাতে না পেরে 'অনুমতি' দেওয়া হয়েছে। কারণ দলীয় সিদ্ধান্ত যাই হোক, সবাই যে 'ভোটারের চাপে' শেষ পর্যন্ত শপথ নেবেনই- এ ব্যাপারে বিএনপি হাইকমান্ডেরও কোনো সন্দেহ ছিল না। কারণ সংবিধান বিশেষজ্ঞরা যাই বলুন, কয়েকদিন আগে আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, দল থেকে বহিস্কার করা হলেও সংসদ সদস্যপদ খারিজ হবে না।

শপথ নিয়ে বিএনপির সর্বশেষ পরিস্থিতিকে অনেকে গোপাল ভাঁড়ের গল্পের সঙ্গে মেলাতে পারেন। একদিন ধামাভরা খই নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। পথের পাশেই ছিল কৃষ্ণ মন্দির। খাদ্যদ্রব্য নিয়ে মন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কিছুটা দেবতার ভোগে দেওয়াই রেওয়াজ। কিন্তু গোপাল ছিলেন হাড়কিপটে। তিনি মন্দির না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বাতাস এসে ধামা থেকে কিছু খই উড়ে পড়ে যায়। সেটা দেখে গোপাল বলে ওঠেন 'উড়ো খই গোবিন্দ নমঃ'। অর্থাৎ, উড়ে যাওয়া খইগুলো গোবিন্দের উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত। বলা বাহুল্য, কৃষ্টের আরেক নাম গোবিন্দ। একইভাবে বিএনপি যখন দেখেছে, এমপিদের কোনোভাবেই শপথ নেওয়া থেকে আটকানো সম্ভব হচ্ছে না, তখন শপথের নির্দেশনাই মঙ্গল।

এই যুক্তিও অসঙ্গত হবে না যে, এতকিছু, সমালোচকদের ভাষায় 'নাটক' না করে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিতরা একসঙ্গে আরও আগেই শপথ নিতে পারতেন। চার এমপির শপথের পর সোমবার সন্ধ্যার সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম নিজেও শপথের পক্ষে মোক্ষম যুক্তি দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন- 'ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, দেশনেত্রীর মুক্তির দাবিতে সংসদে কথা বলার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংসদ, রাজপথের সংগ্রাম যুগপৎভাবে চালিয়ে যাওয়াকে যুক্তিযুক্ত মনে করেছি।' বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষীরাও তো শপথ নেওয়ার পক্ষে এই যুক্তিই প্রথম থেকে দেখিয়ে আসছিল। জাহিদুর রহমানও কি শপথ নিয়ে একই যুক্তি দেখাননি? অনিবার্য পারাপারেও তাহলে কেন শেষ খেয়ার জন্য অপেক্ষা? কেন শেষ ট্রেনও হেলায় ছেড়ে দিয়ে স্টেশন মাস্টারের কাছে সময় বাড়ানোর ধরনা?

আমার ধারণা, বিএনপি বিলম্ব করছিল আসলে শপথ নিয়ে সরকারের সঙ্গে দরকষাকষির আশায়। এমপিদের সংসদে যোগদানের বদলে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি না হোক, নিদেনপক্ষে জামিনে মুক্তি যাতে সম্ভব হয়। রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমের অলিগলিতে অবশ্য ভেসে বেড়াচ্ছিল এ কথা যে, দরকষাকষি চলছে আসলে খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে। এমনও শোনা গেছে, তিনি বিদেশে চলে যাবেন চিকিৎসার জন্য। কিন্তু প্যারোলে মুক্তি খালেদা জিয়া এবং বিএনপির জন্য যে রাজনৈতিকভাবে বুমেরাং হতো, সেটাও মোটামুটি বোধগম্য। যদিও শেষ পর্যন্ত যেভাবে দলটির এমপিরা শপথ নিলেন, যেভাবে মহাসচিব শপথ নিতে পারেন, তাতে করে মনে হচ্ছে সরকার খালেদা জিয়ার প্যারোলের ব্যাপারেও ইতিবাচক ছিল না। নাজিমুদ্দিন রোডের নিঃসঙ্গ কারগার থেকে শাহবাগের জনাকীর্ণ হাসপাতাল পর্যন্তই 'ছাড়' দিতে চেয়েছে।

অস্বীকারের অবকাশ নেই যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ন্যায্য নানা প্রশ্ন রয়েছে। নৈতিকতার দিক থেকে দেখলে, এমন একটি নির্বাচনের পর বিএনপির পক্ষে ফলাফল প্রত্যাখ্যান এবং শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত অন্তত বেঠিক নয়। কিন্তু এর নাম রাজনীতি। এর ব্যাকরণ ভাষার ব্যাকরণের মতো সুনির্দিষ্ট নয়। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে নিয়ম পাল্টাতে হয়। এর কৌশল যুদ্ধক্ষেত্রের মতো নয়; যাই ঘটুক এগিয়ে যেতে হবে। রাজনীতিতে দুই পা এগোনোর জন্য কখনও কখনও এক পা পেছাতে হয়।

চার এমপিকে শপথের নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপি বিলম্বে হলেও এক পা পিছিয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও শপথ নেবেন। জাহিদুর রহমানের বহিস্কারাদেশও নিশ্চয়ই প্রত্যাহার হবে। ঐক্যফ্রন্টের দুই এমপিও তাদের সঙ্গে একই কাতারে দাঁড়ালে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আটজন যদি সংসদে সোচ্চার হন, রাজপথে আট হাজার মানুষের মিছিল-সমাবেশের চেয়েও সেটা কার্যকর হবে। তাতে করে আজকের এক পা পেছানোর বদলে আগামীর রাজনীতিতে দুই পা অগ্রগতি ঘটতেও পারে।


শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক

skrokon@gmail.com



মন্তব্য


অন্যান্য