কৃষি

প্রকৃতি

আরেক শত্রু আর্মিওয়ার্ম

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৮ | আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

আরেক শত্রু আর্মিওয়ার্ম

  ইজাজ আহমেদ মিলন, গাজীপুর

আমেরিকায় বিভিন্ন গাছের জন্য ভয়ঙ্কর পোকা ফল আর্মিওয়ার্ম বাংলাদেশেও আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। সারা বিশ্বে ফল আর্মিওয়ার্ম উদ্ভিদ বিধ্বংসী পোকা হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন দেশে এ পোকা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই পোকার আক্রমণে বিশ্বের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ব্যাপক ফসলহানি, এমনকি দুর্ভিক্ষেরও সৃষ্টি হয়েছে।

গাজীপুরের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. সৈয়দ নূরুল আলম জানান, আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, সম্প্রতি ভারতের কর্নাটক এবং তামিলনাড়ূ রাজ্যে এ পোকার আক্রমণ দেখা গেছে। এটা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এ পোকার আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়নি। তবে যেহেতু পাশের দেশে এর আক্রমণ শুরু হয়েছে সুতরাং যে কোনো সময় পোকাটি এ দেশে অনুপ্রবেশ করতে পারে। তিনি বলেন, প্রাথমিক অবস্থাতেই পোকাটির অবস্থান শনাক্ত করা না গেলে দেশে ব্যাপক ফসলহানি, বিশেষ করে ভুট্টা ফসলের মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. আবুল কালাম আযাদ বলেন, ফল আর্মিওয়ার্ম মারাত্মক ক্ষতিকর। ২০১৬ সালে এটির প্রথম আক্রমণ আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে দেখা যায়। পরের বছর প্রথম দিকেই ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে ব্যাপক ফসলহানি করে, এমনকি দুর্ভিক্ষেরও সৃষ্টি হয়।

কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভুট্টা, তুলা, বাদাম, তামাক, ধান, বিভিন্ন ধরনের ফলসহ প্রায় ৮০টি ফসলে আক্রমণ করে থাকে ফল আর্মিওয়ার্ম। তবে ভুট্টা ফসলে এর আক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। পোকাটি কিড়া অবস্থায় গাছের পাতা ও ফল খেয়ে থাকে। কিড়ার প্রাথমিক অবস্থায় এদের খাদ্য চাহিদা অনেক কম থাকে, তবে শেষ ধাপগুলোতে খাদ্য চাহিদা প্রায় ৫০ গুণ বৃদ্ধি পায়। সে কারণে কিড়ার ৪-৬ ধাপগুলো অর্থাৎ কিড়া পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগে রাক্ষুসে হয়ে ওঠে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে। এমনকি এক রাতের মধ্যে এরা সব ফসল নষ্ট করে ফেলতে পারে। পোকাটি সঙ্গনিরোধ বালাই হিসেবে পরিচিত এবং ডিম ও পুত্তুলি অবস্থায় বিভিন্ন উদ্ভিদজাত উপাদান যেমন- বীজ, চারা, কলম, কন্দ, চারা সংলগ্ন মাটি ইত্যাদির মাধ্যমে বিস্তারলাভ করতে পারে। পূর্ণাঙ্গ পোকা অনেকদূর পর্যন্ত উড়তে পারে। এমনকি ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে কয়েকশ' কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকতা ড. দেবাশীষ সরকার বলেন, পোকাটি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা এবং সরাসরি পোকা খাওয়ার লক্ষণ দেখে বা কিড়া শনাক্ত করে এ পোকার আক্রমণ চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে ফল আর্মিওয়ার্ম পোকার আক্রমণ পর্যবেক্ষণ করা যায়। তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ উইংয়ের আমদানি করা বিভিন্ন উদ্ভিদজাত উপাদানে পোকাটির বিভিন্ন পর্যায়ের উপস্থিতি পরীক্ষা করা এবং উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের মাঠ পর্যায়ে ফেরোমন ফাঁদের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া ফল আর্মিওয়ার্মের ফেরোমন ফাঁদে পোকা পাওয়া গেলে বা লক্ষণ অনুযায়ী কোনো ফসলে বিশেষ করে ভুট্টায় পোকার আক্রমণ দেখা গেলে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বা বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটকে জরুরি ভিত্তিতে অবহিত করার জন্য তিনি পরামর্শ দিয়েছেন।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

ডিজেলে ভর্তুকি চায় কৃষক


আরও খবর

কৃষি
ডিজেলে ভর্তুকি চায় কৃষক

বোরোর আবাদ

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলতাব হোসেন

নতুন সরকারের কাছে বোরো ধান উৎপাদনে সেচ কাজে ব্যবহূত ডিজেলে ভর্তুকি প্রত্যাশা করছেন দেশের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি কৃষক। ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এবং কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় বোরো উৎপাদনে তাদের লোকসানে পড়তে হয়। এ ধান চাষের মোট খরচের ৪৬ শতাংশ যায় সেচে। ডিজেল ও সার নগদ টাকায় কিনতে হয়। ফলে ক্ষুদ্র কৃষক মহাজনের ঋণে আটকা পড়েন।

ঋণ ও লোকসানের আশঙ্কা মাথায় নিয়ে এর পরও শীত আর হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করে কৃষক বোরো ধানের চারা লাগাতে শুরু করেছেন। কারণ প্রচণ্ড শীত ও কুয়াশায় এ ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শীত দীর্ঘায়িত হলে চারা 'কোল্ড ইনজুরিতে' পড়তে পারে।

কাকডাকা ভোরে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষক এখন জমিতে হাল চাষ, চারা তোলা এবং রোপণের কাজ করছেন। হাওর অঞ্চলে চলছে আগাম জাতের বোরো রোপণের কাজ। সার ও ডিজেলের সংকট এবং অকাল বন্যা না হলে বরাবরের মতো এবারও বাম্পার ফলন হবে। এমন আশার মধ্যেই কৃষকের শঙ্কা সেচের খরচ নিয়ে। এ জন্য কৃষক এ সময়ে ডিজেলে ভর্তুকি চেয়েছেন। ব্যয় কমাতে ভর্তুকি না পেলে তারা বোরো চাষে লাভের মুখ দেখতে পারবেন না। আবারও লোকসানে পড়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে যাবেন। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সেচের পিক সিজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেচে বিদ্যুৎচালিত পাম্পের ব্যবহার বাড়লেও এখনও বিপুলসংখ্যক কৃষক ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করেন। কৃষক এখন কৃষি খাতে ভর্তুকির টাকা পান সার কিনতে। ডিজেলের জন্য ২০১০ সালের পর থেকে সরকারি প্রণোদনা বন্ধ।

সর্বশেষ ২০১০ সালে বোরো মৌসুমে আওয়ামী লীগ সরকার ৯১ লাখ কৃষককে সেচে ডিজেলের ভর্তুকি হিসেবে ৭৫০ কোটি টাকা দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেট ও নেত্রকোনায় এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন। এরপর থেকে  বাজেটে সরকার সেচ কাজে ডিজেলের ভর্তুকি হিসেবে ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখলেও কৃষি খাতের ভর্তুকির এ অর্থ সার আমদানিতে দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি এবার তারা ডিজেলেও ভর্তুকির দাবি জানিয়েছেন।

নওগাঁ সদর উপজেলার চকপ্রাণ গ্রামের কৃষক হাফিজ উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে এরই মধ্যে সার ও বীজ ধান কিনতে এবং সেচসহ বিঘাপ্রতি খরচ প্রায় তিন হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। এখন সেচের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে ডিজেলে ভর্তুকি দাবি করেন।

ছাতকের সিংচাপইড় ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল জলিল জানান, গত বছর বাম্পার ফলন হলেও এর আগে টানা তিন বছর আগাম বন্যায় হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে ফসলহানি হয়। এ জন্য নতুন সরকারের কাছে ১০ টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সার ও ডিজেল ভর্তুকির টাকা নগদে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মৌসুমের শুরুতেই টাকার দরকার বেশি হয় বলে জানান তিনি।

নেত্রকোনার দুর্গাপুরের ভাদুয়া গ্রামের কৃষক আবু সামা সমকালকে বলেন, প্রচণ্ড শীত ও কুয়াশায় গত বছরের মতো এবারও বীজতলার ক্ষতি হয়েছে। তিনি অন্যের কাছ থেকে চারা কিনে রোপণ করছেন। তার মতে, বোরো চাষের খরচ এবার অনেক বেশি হবে।

দেশে প্রায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার ডিজেল এবং ২ লাখ ৭০ হাজার বৈদ্যুতিক পাম্প রয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ১৬ লাখ টন ডিজেল সেচে ব্যবহার করা হয়। বোরো মৌসুমে অনেক সময় ডিজেলের ঘাটতি তৈরি হয়। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে ডিজেলের দাম বাড়ে। ডিজেল ও সার পাচার হয়। এ মৌসুমে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক সারওয়ার আলম বলেন, বোরো মৌসুমের জন্য সাড়ে ১৬ লাখ টন ডিজেল মজুদ থাকায় কোনো সংকট হবে না। বিভিন্ন ডিপোতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে তদারকি করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক জোবায়ের আহমেদ বলেন, চলতি মৌসুমে সার ও ডিজেল সংকট নিরসনে সরকার বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সার ও ডিজেলের ব্যাপক মজুদ রয়েছে। এসবের চোরাচালান ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সেচ কাজে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে পিডিবিকে অনুরোধ করা হয়েছে।

ডিএই চলতি বছর সাড়ে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে আবাদ করে ১ কোটি ৯৪ লাখ টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।